রাস্তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুঁজেও আট নম্বর বাড়িটি পাওয়া গেলো না। হ্যাঁ, চেক রিপাবলিক আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে ২৬তম আসরে আমরা এই বাড়িতেই কদিন থাকবো। এটা আয়োজক কবি ভেরা কোপেচকার বাড়ি। ভেরার সাথে আমার পরিচয় পোলানিৎসা কবিতা উৎসবে। তিনি গত বছর বলেছিলেন, “তুমি তো আমার উৎসবে একবারও এলে না।” আমি বলেছিলাম যে আপনি চাইলে আগামী বছরই আসতে পারি, তবে সব যোগাযোগ আমার অনুবাদক ক্যাতারজিনার সাথেই রাখতে হবে। তিনিই আমাকে পোল্যান্ড থেকে গাড়ি চালিয়ে আপনার শহর ব্রামোভ-এ অনায়াসে নিয়ে যেতে পারবেন। ফলত, ইতোমধ্যে তিনি ক্যাতারজিনার থেকে আমার কবিতার পোলিশ অনুবাদ ও আমার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি চেয়ে নিয়েছেন। এবং তাঁকেই বলেছেন যে, তোমরা দুজন আমার বাড়িতে থাকবে।
রাস্তার শেষ মাথা থেকে আবারও পিছন দিকে আসলাম আমরা। দশ, এগারো, নয়, সাত, তোরো সব বাড়িই পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু রাস্তার উপরে কোথাও আট নম্বর বাড়ির সাইন নেই। শেষ পর্যন্ত বারো নম্বর বাড়িতে গাড়ি নিয়ে ঢুকে গেলাম, কিন্তু হ্যালো হ্যালো করেও কাউকে পাওয়া গেলো না। দশ নম্বর বাড়ি থেকে অবশ্য এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে আমাদের বললেন, “ওই যে হলুদ গারবেজ ক্যানটা দেখছেন, ওখান দিয়ে সোজা পাহাড়ে উঠে গেলেই ভেরার বাড়ি!” কিন্তু কোথায় কি! আট আর খুঁজে পেলাম না। একদিকে সন্ধ্যা নেমে গেছে অন্যদিকে আমাদের দুজনের ফোনেই পোল্যান্ডের সিমকার্ড লাগানো, তারাও এখন অকেজো। কাউকে ফোন করারও উপায় নেই। আমি ক্যাতারজিনাকে বললাম, “চলো কোনো রেস্টুরেন্টে ঢুকে তাদের ওয়াইফাই ব্যবহার করে ভেরাকে ফোন করি।” কিন্তু ভেরার ফোন নাম্বারও ক্যাতারজিনার কাছে নেই। সব যোগাযোগই নাকি ইমেলে হয়েছে। লাও ঢেলা!
পোল্যান্ড থেকে চেক রিপাবলিকে ঢুকতে আমাদের বর্ডারে কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। আমি কোথাও কোনো পুলিশও দেখিনি, যদিও ক্যাতারজিনা বলেছিলেন যে ওইখানে রাইফেল হাতে একজন সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমি দেখিনি। শুধু দেখেছি পাহাড় আর পাহাড়। এমনিতে পোল্যান্ডে পাহাড় নাই বললেই চলে। শুধু এই দক্ষিণ দিকটা, এবং দক্ষিণ-পূর্ব বর্ডারে পাহাড় আর পাহাড়। এবং তাই পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সরু পথে চেক রিপাকলিকে ঢুকেই কাতারজিনা বললেন, আমার রোড ম্যাপ কাজ করছে না। তখনও আমার গুগল ম্যাপ সচল। অতএব গুগল ম্যাপ দেখে আমরা বাকি পথ পাড়ি দেবার আগে একটি রেস্টুরেন্ট পেয়ে গেলাম। সেখানে ঢুকে বোঝা গেলো যে এরা ইংরেজি তো জানেই না, পোলিশও ভাঙা ভাঙা বোঝে। তাই দিয়েই ক্যাতারজিনা খাবারের অর্ডার দিলেন। প্রথমে টমেটোর স্যুপ ও পরে থালা ভর্তি রুটি আর মুরগির মাংস দেখে আমার পুরোপুরি অবাক হবার পালা।
“এত খাবার কি করে খাবো?” বাথরুম থেকে এসেই আমি ক্যাতারজিনার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম।
“ওই তো অতিরিক্ত প্লেট দিয়ে গেছে, যা খেতে পারবে না ওটায় তুলে রাখো।” ক্যাতারজিনার সহজ সমাধান।
আমি খাবারে কাটা চামচ ছোঁয়ানোর আগেই অর্ধেকটা পাশের প্লেটে তুলে রাখলাম।
ক্যাতারজিনা বললেন, “বাথরুমটা দেখে বুঝলে পোল্যান্ড আর চেক রিপাবলিকের পার্থক্য?”
আমি বলি, “কেন বুঝবো না! চেক রিপাবলিকে ঢুকেই ধূলিমলিন রাস্তা দেখেই তো সেটা বুঝতে পেরেছি। তাছাড়া অর্থনৈতিক দিক দিয়েও তোমরা ভালো অবস্থানে আছো, সেটা কারেন্সির বিনিময় দেখলেই বোঝা যায়।”
দেশ বিদেশ ঘুরতে ঘুরতে আমি বুঝতে পেরেছি যে ডলারের সমান্তরালে কারেন্সির বিনিময় দেখেই একটি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা ধারণা করা যায়। আমার সেই ধারণা ইদানীং তেমন ভুল হয় না। তবে ব্রানোভ-এর কোবলস্টোন রোডগুলো অনেকটা এডিনবরার মতো বলে মনে হয়। বিল্ডিংগুলো ঠিক একই ধরনের! পরদিন এ কথা বললে ক্যাতারজিনা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি স্ক্যটল্যান্ডের এডিনবারর্গয়ের কথা বলছো!”
আমি বললাম, “দেখো এই পাহাড়ি পথ ধরে ক্যাসেলে যাবার যে রাস্তাটা ঠিক এমনই একটি পাহাড়ি পথ ধরে এডিনবরা ক্যাসেলে যেতে হয়।”
তিনি বললেন, “দেখো, ইয়োরোপের অনেক কিছুই প্রায় একই রকম।”
বর্ডারের হোটেল থেকে বেরুনোর সময় ওয়েট্রেসের কোলে ছোটো বাচ্চা দেখে বললাম, “বয়স কত?” তিনি জানালেন যে মেয়েটির বয়স মাত্র দুই। আরো বললেন যে তার পাঁচ ছেলে-মেয়ে। আমি দুই বছরের ওই মেয়ের হাতে দশ করোনার একটি কয়েন ধরিয়ে দিয়ে ‘বাই’ বলে বেরিয়ে পড়লাম। হ্যাঁ, ‘করোনা’ হলো চেক রিপাবলিকের ক্যারেন্সির নাম, যেমন স্লটে পোলিশ কারেন্সি। রেস্টুরেন্টের ফ্রি ওয়াইফাই দিয়েই গুগল ম্যাপ ঠিক করে নিলাম। পথে ইন্টারনেট না থাকলেও, একবার গুগলম্যাপ ঠিক করা থাকলে সেটি যে চলতে থাকে তা আমি আগে থেকে জানি। যাহোক, আট নম্বর বাড়ি খুঁজতে এসে একসময় “ইউ হ্যাব রিসচড ইয়োর ডেস্টিনেশন” বলে তিনিও অফ হয়ে গেলেন। কিন্তু এবাড়ি ওবাড়ি করে আমরা খুঁজতেই থাকলাম। ক্যাতারজিনা বললেন, “ওই দেখো রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইক্রোফোন বসানো। এখানকার ভিলেজগুলোতে সবাই একত্রিত। আমাদের আবার কেউ চোর-ডাকাত ঠাহর করে না নেয়!”
ইতোমধ্যে একজন শিক্ষিত গোছের ভদ্রলোককে একটা বাড়ির সামনে দেখে, গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে ক্যাতারজিনা বললেন, “সুপরাসাম, আমরা পোল্যান্ড থেকে এসেছি। ভেরা কোপেসকা পোয়েটা, তাঁর আট নম্বর বাড়িটা খুঁজছি।”
ভদ্রলোক বললেন, “ওই দেখো বাম দিকে ঘাসে ঢাকা একটা রাস্তা পাহাড়ে উঠে গেছে, ওটা দিয়ে সোজা উঠে গেলেই পেয়ে যাবে।”
আমরা তাই করলাম। এবং উপরে উঠে দেখি আমাদের কাঙ্ক্ষিত নম্বর, আট।”
কিন্তু বেল বাজালাম, দরজায় ঠক ঠক করলাম, কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। ক্যাতারজিনা ঘুরে বাড়ির অন্যপাশে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে কলিংবেল টিপলেন। মনে হলো ওটাই সদর দরজা। আমাকে ইশারায় বললেন যে কেউ একজন যে ভেতর থেকে গেটের দিকে আসছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। এবং মিনিটখানেকের মধ্যে ভেরার মুখখানা দেখে আমার মনে হলো এই ঘুটঘুটি সন্ধ্যায় আকাশের চাঁদ মেঘ ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।
আমাদের আগেই সেখানে স্লোভাকিয়ার কবি দানুসিয়া এসে পড়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে বেশ পরিপাটি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে গল্প করছিলেন ভেরার সাথে। আমাদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলেন ভেরা। পাশেই একটি রুম দেখিয়ে ক্যাতারজিনাকে বললেন, “এখানে তোমার লাগেজ নিয়ে আসো। এই রুমেই তুমি থাকবে।” আর আমাকে বললেন, “তুমি আমার সাথে আসো। তোমার রুমটা দেখিয়ে দেই। তুমি থাকবে দোতলায়।”
আমি লাগেজ নিয়ে ভেরার পিছু পিছু ঘোরানো প্যাঁচানো উপন্যাসের মতো সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেলাম। দরজা ঠেলে ঢুকেই বললেন, “এই রুমটি তোমার।” ভেতর দিকে আরেকটি দরজা ঢেলে দেখি ওখানে অন্য একটি লাগোয়া রুম। সেখানে তিনটি বেড। মনে মনে বলি হায় হায়, আমার রুমের ভেতর দিয়ে যদি তিনজন মানুষ আসা যাওয়া করে, আমি কীভাবে এখানে থাকবো। জিজ্ঞেস করলাম, “এই রুমে কে কে থাকবেন?” তিনি বললেন, “ইউক্রেন থেকে আসছেন সারগেই আর আমাদের এক কবি পিটার!” সাথে সাথে তিনি যোগ করলেন, “এখানে একটু ঠান্ডা আছে, কিন্তু তোমাকে দুটি হিটার দেওয়া হবে।” আমি মনে মনে ঢোক গিললাম, একটু ঠান্ডা! আর ছোট্ট একটা পুচকে ইলেকট্রিক হিটার দেখে বুঝতে পারলাম যে আগামী কয় রাত আমার বেশ বেকায়দায়ই কাটবে। মনে পড়লো রাজেন্দ্র কলেজের হোস্টেলে একরুমে ছয়জন থাকার কথা। কিন্তু সেতো প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা।
তিনি আমাকে বাথরুম দেখিয়ে দিলেন। বললেন, “কিছু মনে করবে না, বাথরুমে কোনো আলো নেই।” আমি বললাম, “আমার ফোনের লাইট জ্বালিয়ে নেবো। চিন্তার কিছু নেই।” কিন্তু পরে আবিষ্কার করলাম যে সেই বাথরুমে পানিও নেই। শুধু একটি কমোট বসানো, তাও উলটো করে। ঠিক উলটো নয়, দেখলে মনে হবে কমোটের ছিদ্রটি উলটো দিকে। হ্যাঁ এমন কমোট আমি আরো একবার দেখেছিলাম নিউইয়র্কের গ্রিনিজ ভিলেজে প্রয়াত কবি এডিসের বাসায়। সেখানে মাসে মাসে কবিতার আসর বসতো। আমাকে মাইক গ্রেভস কয়েকবার ফিচার করে নিয়ে গেছেন। কবিতা পড়েছি। সেই বাসার বাথরুমে এরকম কমোট দেখেছি। অর্থাৎ এই কমোটের বয়স কম করে হলেও একশ বছর।
ভেরা নিচে নেমে গেলে আমি লাগেজ ঠিক জায়গায় রাখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম রুমের একপাশে একটি বেসিন, এবং সেটাই এই দোতলার একমাত্র পানির উৎস। একতলায় সেন্ট্রাল হিটিং বার্নারের সাহায্যে চললেও দোতলার বার্নারটি দেখে মনে হলো যে সেটি বহুকাল ধরে অকেজো। অতএব, আমাকে যে দুটি হিটারের মাধ্যমে রুম গরম রাখার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, তার একটি নষ্ট ও অন্যটি চাহিদার থেকে অপ্রতুল।
যাহোক, বেশ মন খারাপ করে নিচে আসতেই দেখলাম চা নাস্তা দেওয়া হয়েছে। ক্যাতারজিনা ইতোমধ্যে কফিতে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে গল্প করছেন ভেরা ও দানুসিয়ার সাথে। আমি চায়ের টেবিলে বসতেই ভেরা আমার হাতে দুটি বই ধরিয়ে দিলেন। খুলে দেখি দুটিই শুরু হয়েছে আমার কবিতা দিয়ে।
ভেরা নিজে চেক ভাষায় কথা বললেও তিনি পোলিশ বলেন ও বোঝেন। এই অঞ্চলের ভাষাগুলোর সাথে বেশ মিল থাকায় পাশাপাশি দেশগুলোর মানুষের কমিউনিকেশনের সুবিধা আছে। তাই তিনি ক্যাতারজিনাকে দোভাষী করে আমার সাথে কথা বলছেন। জানালেন যে একটি হলো উৎসব সংকলন যাতে প্রত্যেক কবি সর্বোচ্চ তিন পৃষ্ঠা পেয়েছেন। আমি পাতা উলটিয়ে দেখলাম, প্রথম তিন পৃষ্ঠা জুড়ে আমার ‘হাত ধরে রেখেছে সময়’ কবিতাটির পোলিশ অনুবাদ ছাপা হয়েছে। আর দ্বিতীয় বইটি বেশ চমকপ্রদ। দশজন কবিকে বেছে নিয়ে তিনি প্রত্যেকের আট/দশটি কবিতা চেক ভাষায় অনুবাদ করে সেখানে স্থান দিয়েছেন। প্রত্যেক কবির এক পৃষ্ঠার পরিচিতি ও তাঁর উপস্থাপিত কবিতাংশের একটি আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে, যেমন আমার কবিতাগুলোর শিরোনাম আমার পোলিশ ভাষায় অনূদিত প্রথম বইয়ের নামে, ‘আন্ডার দ্যা থিন লেয়ারস অব লাইট’। এন্থোলজির শিরোনাম হলো ‘নুয যেহেডে সুলেনসে’ অর্থ সানসেট বা সূর্যাস্ত। এই এন্থোলজির বৈশিষ্ট্য হলো সব কবিতাই পোলিশ ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে। আটজন পোলিশ, একজন বাঙালি ও একজন ইউক্রেনের কবি। শেষোক্ত দুজনের কবিতা পোলিশ অনুবাদ থেকে চেক ভাষায় অনুবাদ করেছেন ভেরা। যে সব কবি স্থান পেয়েছেন তাঁরা হলেন হাসানআল আব্দুল্লাহ, দানুতা বারতোস, কাজিমেয়ারেজ বুরনাত, এন্থোনিও মাটসুকিভিজ, যোফিয়া মিরস্কা, তেরেসা পডেস্কা-এবেট, টিডোজিয় সুভিডরেস্কা, সারগেই সেলকোভ, ও ইয়েলিয়াস ভেটরোভা।
চা খেতে খেতে বই দুটো উলটে পাল্টে দেখলাম। ক্যাতারজিনার মন খারাপ হয়ে গেলো যে, তাঁকে দাওয়াত করেও এই এন্থোলজিতে তাঁর কবিতা রাখা হয়নি। অবশ্য ভেরা নিজে থেকে তার কাছে ক্ষমা চাইলেন। উপর্যুপরি অবস্থা দৃশ্যে মনে হলো, তাকে শুধু আমার অনুবাদ হিসেবেই দাওয়াত করা হয়েছে, যদিও উৎসব এন্থোলজিতে তাঁর দুটি কবিতা আছে।
এক ফাঁকে আমি ক্যাতারজিনার কানে কানে বললাম, “এখানকার যে অবস্থা আমাদের হোটেল খুঁজতে হবে।”
তিনি শিউরে উঠলেন, “বলো কী?”
আমি বললাম, “আমার সাথে উপরে আসো। দেখে যাও।” তখনও সারগেই বা পিটার এসে পৌঁছাননি। তাই উপরে গিয়ে ক্যাতারজিনা দুটো রুমই দেখার সুযোগ পেলেন। বললেন, “ভেরা তো ঠিকই বলেছেন, তুমি একটা আলাদা রুম পেয়েছো।”
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম, “আমার রুমের ভেতর দিয়ে আরো দুইজন অনবরত যাওয়া আসা করবেন, আর আমি আলাদা রুম পেয়েছি।” হিটারের দিকে অঙুলি নির্দেশ করে বললাম, “তোমার কি মনে হয় এই পুচকে হিটারে কিছু হবে!”
ক্যাতারজিনা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “দেখো, তুমি আর আমি যা বুঝছি, ভেরা কিন্তু তা বুঝছে না। এটা তার বাড়ি, সে এখানেই থাকে। ফলে এটা তার কাছে স্বর্গ সমান। তোমাকে আর আমাকে ভালোবেসে এখানে থাকতে দিয়েছে। এখন যদি আমরা এখান থেকে হোটেলে চলে যাই, পুরো উৎসবটিই আমাদের জন্যে মাটি হয়ে যাবে।” তিনি বিনয়ের সুরে বললেন, “তাই যত কষ্টই হোক দুতিনটে রাত এখানে কাটিয়ে দাও।” তিনি জানলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর আমি দেখি একটা বেডসিট পর্দা আকারে টানিয়ে দেওয়া যায় কি না।” দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার ফিরে এসে বললেন, “এখনই হিটার চালিয়ে দাও যাতে তুমি রাতের খাবার খেয়ে ফিরে আসতে আসতে রুম গরম হয়ে থাকে। আর তুমি অপেক্ষা করো, আমার বেড সিটটা নিয়ে আসি।”
আমি বাধা দিলাম, “না না তোমার বেডসিট আনলে তুমি ঘুমাবে কী করে।”
“না না আমার কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু জানালায় একটা মোটা পর্দা না দিলে সারারাত তোমার ঘুম হবে না।” তিনি জানেন যে জানলা দিয়ে আলো এলে আমি ঘুমাতে পারি না। নিজের বাড়িতেও আমার রুমের দুই জানলাম অতিরিক্ত দুটো মোটা পর্দা টাঙিয়ে দিয়েছেন। অতএব আমার কোনো বাধা না শুনে তিনি নিচের থেকে মুহূর্তের মধ্যে বেডসিট নিয়ে এলেন। ভেরাও তাঁর সাথে সাথে এলেন। আমি জানালায় চাদরটা টানাতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম। ভেরা সম্ভবত ক্যাতারজিনাকে জিজ্ঞেস করলেন ওটা কেনো টানাতে হবে। ক্যাতারজিনা পোলিশ ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন যে আমার ঘুমের সমস্যা আছে। অতএব তিনি আর রা না করে নিচে চলে গেলেন। কাতারজিনা জানলার কাছে রাখা সোফার উপরে একটা চেয়ার দিয়ে আমাকে বললেন, “এটার উপরে উঠে পর্দাটা টানিয়ে দাও।” তিনি চেয়ার শক্ত করে ধরলেন। আমি বললাম, “পড়ে গেলে কিন্তু সোজা হাসপাতালে!” তিনি বললেন, “আমি ধরে বসবো।”
জানালায় আগে থেকেই পাতলা একটা ট্রান্সপ্যারেন্ট পর্দা ছিলো, তার মানে উপরে বড়ো ধরনের একটি রড লাগানো। আমি রডের উপর দিয়ে চাদরের একপাশ তুলে দিলাম, কিন্তু সে স্লাইড করে পড়ে গেলো। আমি ক্যাতারজিনাকে বললাম, “এক কাজ করো, আমাকে ওখান থেকে কয়েকটি বই দাও।” রুমে বেশ কয়েকটি বইয়ের র্যাক। ক্যাতারজিনা বললেন, “কি বই দেবো।” আমি হেসে উঠলাম, “জানলা বই পড়বে না। তাই যেকোনো বই দিলেই চলবে।”
দুটি বই দিয়ে রডের ও দেয়ালের সাথে আড়াআড়ি চাদরটা আটকে দিয়ে বললাম, “অশেষ ধন্যবাদ। তোমার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না।”
তিনি নিচে যেতে যেতে বললেন, “এখানে সম্ভবত রাতে খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে।”
সারগেইর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেলো। দানুসিয়া জানালেন তিনি নাকি ব্রামোভ থেকে পায়ে হেঁটে আসছেন। আমি বলি, “তাও কি সম্ভব!”
দানুসিয়া বললেন, “সারগেইর জন্যে সবই সম্ভব, তিনি আগেও নাকি এ বাড়িতে হেঁটে এসেছেন।” ইতিমধ্যে আমরা ভেরার ওয়াইফাই ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছি। তার মানে পৃথিবীর সাথে সামান্য বিচ্ছিন্ন হাবার পর আবার যুক্ত হতে পেরেছি। ফেসবুক খুলেই দেখলাম যে আমার সোনার বাংলার আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। ক্যাতারজিনাকে দেখালে তিনি আঁতকে উঠেলেন, “কেনো?”
আমার কাথা শুনে তিনি দুঃখপ্রকাশ করলেন।
রাত দশটার পরে ভেরা বললেন যে সারগেই এসেছেন কিন্তু বাসা খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি গরম কাপড় পরে বেরিয়ে গেলেন তাঁকে পথ দেখিয়ে আনতে। কিছুক্ষণ বাদে বিশাল বাংলাদেশি কায়দার একটা সুটকেস হাতে করে ঘরে ঢুকলেন সারগেই। আমাদের সাথে আলাপ বিনিময় হলো। তিনি বললেন, “আমার প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা ৭১টি। আমি আরো কিছু গদ্যও রচনা করেছি।” সাথে সাথে আমাকে প্রশ্ন করলেন, “তুমি তাহলে নিউইয়র্কার, তাই তো?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমি নিউইয়র্কার!”
তিনি ভেরাকে একটি বই সাইন করে দিতে দিতে বললেন, “আমি গত ৪৫ বছর ধরে প্রফেসারি করছি। কিন্তু নিউইয়র্কে একবারও যাওয়া হয়নি।”
আমি বললাম, “পঁয়তাল্লিশ বছর! মানে আপনি এখনো পড়ান।”
“না না চার বছর হলো অবসর নিয়েছি।” তিনি পরিষ্কার করলেন। সাথে সাথে জানালেন যে তিনি ম্যাকানিকেল ইঞ্জিনিয়ার। এই বিষয়েই শিক্ষকতা করতেন।
আমি ম্যাথ পড়াই শুনে তিনি আপ্লুত হলেন। কিন্তু আমার নিজের অবসরে যাবার কথা বা লেখালেখির কথা তাঁকে আর বলতে ইচ্ছা হলো না। তাঁর তেমন কিছু শোনার ধৈর্য বা ইচ্ছা আছে বলেও মনে হলো না। তবে কথায় কথায় বললেন, “শুধু লেখা আর লেখা, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা লিখে যাই!”
এবার আর প্রশ্ন না করে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, “একটানা কত ঘণ্টা কোনো বিরতি না দিয়ে লিখেছেন?”
একটু চিন্তা করে বললেন, “চার ঘণ্টা।”
আমি বললাম, “কোনো বিরতি ছাড়া আমি আঠারো ঘণ্টা লিখেছি এমনও হয়েছে।”
কিন্তু এত দীর্ঘ সময় যে আমি এক নাগাড়ে লিখেছি তাতে তার কিছু যায় আসে না বলেই মনে হলো। তিনি হুঁ-হা করে কাটিয়ে দিলেন। কী জানি ইংরেজি বুঝলেন কিনা বোঝাও গেলো না। পর দিন এক অনুষ্ঠান থেকে অন্য অনুষ্ঠানে যাবার সময় কি যেন বলেছি, তখন তিনি বললেন, “আমি ইংরেজি খুব ভালো বুঝি না। আমাকে ধীরে বলো।” তখন বুঝতে পারলাম যে তিনি নিজে বলেন ঠিকই কিন্তু দ্রুত ইংরেজি বললে তার বুঝতে কষ্ট হয়।
প্রফেসর সারগেই দোতলায় সুটকেস রেখে খেতে এলেন, তখনও আমরা খাবার টেবিলে বসা। তাঁর আসার আগেই আমরা খেয়ে নিয়েছিলাম। আমি বিফ বা পোর্ক খাই না বিধায় দুপুরে রেস্টুরেন্ট থেকে নিয়ে আসা আমার খাবারই রাতে খেলাম। ক্যাতারজিনাকে বললাম, “এত বড়ো মুরগির ফিলে, তুমি একটু নাও।”
তিনি বললেন, “আমার খাবারই আমি খেয়ে পারছি না। পোর্কটা জবর হয়েছে।”
রাতে ঘুমাতে গিয়ে হলো যতো বিপত্তি। সারা ঘর ঠান্ডা রেখে শুধু ছোট্ট একটা হিটারে বিছানার পাশটা গরম করলে কি আর শীতের প্রকোপ থামে? আমি অতিরিক্ত কাপড় জড়িয়ে লেপের মধ্যে ঢোকার আগে ল্যাপটপ খুলে একটু লেখালেখিতে মনোযোগী হলাম। আধা ঘণ্টার মতো লিখে মনে হলো এই শীতে লেপের বাইরে থাকা যাবে না। কিন্তু এমন সময় বাথরুম চাপলো। কিন্তু বেসিনে থেকে বোতলে পানি ভরে নিতে গিয়ে দেখলাম পানি বরফের মতো ঠান্ডা। তারমানে উপরে শুধু হিটের অভাবই নয়, গরম পানিরও অভাব আছে।
হাঁসের পশম দিয়ে তৈরি আমার লেপ, আগেই জানিয়েছিলেন ভেরা। শুয়ে পড়ার কিছুক্ষণের ভেতরেই তা টের পেলাম। গায়ের সব জায়গা দিয়ে চুলকাতে লাগলো এবং পায়ের তলা পুড়ে যাচ্ছিলো। ঘুম ভেঙে দেখি মাত্র বারোটা পঁয়তাল্লিশ। অর্থাৎ ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়েছি।
উঠে প্রথমেই হিটার বন্ধ করলাম। পাশের ঘর থেকে সারগেইর নাকের ডাক শোনা গেলো। তাঁর দরজা বন্ধ। মানে তিনি হিটার ছাড়াই দিব্যি ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। অবশ্য খাবার টেবিলে বলেছিলেন, “আমার এই আটাত্তর বয়সি চামড়ায় শীত ঢুকতে পারে না।”
পিটার আজ আসেননি।
আমি গায়ের পুল অভারটাও খুলে ফেললাম। এবং আবার লেপের তলে গেলাম। কী জানি ঘুম আর হবে কি না! বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পরবো না। জেগে দেখি রাত তিনটে, ঘামে গা ভিজে গেছে। ওদিকে হিসুর চাপ সামলাতে না পেরে দৌড়ে সেই হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে সিঁড়ির গোড়ায় বাথরুমে গেলাম। লিভিংরুমের দরজা খোলা রেখে গেছি তাও বুঝতে পারিনি। এসে দেখি ভেতরে বাইরে একই হিম। কী আর করা আবারও হিটার চালালাম, তবে এবার ওটাকে একটু দূরে রাখলাম। শোবো কি শোবো না ভাবতে ভাবতে ফোনের লাইট নিভিয়ে আবারও শুয়ে পড়লাম। কিন্তু পাঁচটার পরে আর বিছানায় থাকতে পারলাম না।
বেসিনের হিম ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে মোজা জুতা পরে, গায়ে জ্যাকেট চাপিয়ে, হিটারটা শরীরের খুব কাছাকাছি রেখে পাওলো কোয়েলার বই টেনে নিলাম। কিন্তু দুই একপাতা পড়েও মন বাসাতে পারলাম না। ফেসবুকে যাবো তাও হলো না, কারণ ঘুমানোর আগে যখন সীমনের সাথে কথা বলছিলাম তখনই মনে হলো ভেরা তাঁর ওয়াইফাই বন্ধ করে দিয়েছেন। সকালেও নেটের দেখা মিললো না। অতএব ল্যাপটপে ওয়ার্ড খুলে রাতের লেখাটা চালিয়ে যাবার চেষ্টা করলাম। মনে মনে ভাবলাম পরে ওয়াইফাই পুরোপুরি পেলে এখান থেকে গুগল ডকের ফাইলে কপি-পেস্ট করে দেওয়া যাবে।
যাহোক, সকাল সাড়ে সাতটায় নাস্তার জন্যে নিচে নামার কথা। সাড়ে আটটায় বেরিয়ে যাবো আমরা। অতএব কিছুটা সময় হাতে রেখে তৈরি হয়ে নিলাম। টিশার্টের উপরেই ফুলশার্ট পরলাম, কারণ রাতের শীতে ভয় ধরে গিয়েছিলো। ওদিকে প্যান্টের নিচেও থার্মাল পরতে পরতে ভাবলাম প্রায় বিশ বছর পরে এই বস্তুটি পরতে হচ্ছে।
ডিম পাউরুটি চা দুই তিন পিস কাঁচা ক্যাপসিকাম আর লম্বা করে কাটা চিজ দিয়ে নাস্তা বেশ জমজমাট হলো। আমার মতো স্যুট টাই পরেই প্রফেসর সারগেই হাজির হয়েছেন। তিনিও যথারীতি পেট পুরে খেলেন। খাওয়া শেষে ক্যাতারজিনা বললেন, “এদের সব মালপত্র নিয়ে এখন আমাকে যেতে হবে। এমনিতেই আমার কবিতা এন্থোলজিতে ছাপেনি। তারপরে আমাকে ওদের সংগঠনেরই একজন মনে করে খাটিয়ে নিচ্ছে।”
আমি বইয়ের বান্ডিল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গাড়িতে তুলে দিতে সাহায্য করলাম। কাজিমেয়ারেজ বুরনাতের জন্যে নিউইয়র্ক থেকে যে গিফট এনেছিলাম সেটাও একটি আলাদা ব্যাগে রাখলাম।
ভেরার বাড়ি যে জায়গাটিতে তার নাম কারনিসে, আমরা সেখান থেকে ব্রানোভের দিকে গেলাম। ক্যাতারজিনাকে ভেরাই পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। ব্রানোভ মনেস্টারি হল, যেটি আদতে একটি ক্যাসেল, যেখানে একসময় ধর্মযাজক থাকতেন এবং প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় শিক্ষালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেখানেই হবে আজকের মূল অনুষ্ঠান। ক্যাতারজিনা আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন যে চেক রিপাবলিকে ধর্ম প্রায় উঠে গেছে বললেই চলে। চার্চগুলো এখন কালচারাল সেন্টার। চার্চে মানুষ আর যায় না। শুনে আমার যারপরনাই ভালো লেগেছিলো। হয়ত একদিন সারা পৃথিবী এমন হয়ে যাবে। ধর্ম দিয়ে মানুষকে শোষণের দিন শেষ হবে। যাহোক, আমার মনেস্টারির খুব কাছাকাছি একটি বিশাল স্কুল ভবনের পার্কংয়ে গাড়ি রাখলাম। নেমেই দেখি কবি কাজিমেয়ারেজ বুরনাতও গাড়ি পার্ক করছেন। আমি তাঁর জন্যে আনা গিফট ব্যাগটি হাতে করে ছুটে গেলাম, তিনিও পরম বন্ধুত্বে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি কিছুক্ষণের ভেতর তুলনাহীন এক ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রইলাম। কুশল বিনিময় শেষে তার হাতে উপহারের ব্যাগ তুলে দিলাম। তিনি শব্দগুচ্ছ নতুন সংখ্যার কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমি গিফট ব্যাগ থেকে ওটা বের করতে গিয়ে দেখি ভুলে আগের সংখ্যাটি ঢুকিয়ে রেখেছি। বললাম, “রুমে আছে, আমি পরে এনে দেবো।”
আমরা সবাই মিলে হাস্যজ্জ্বল সৌহার্দ্য বিনিময় করতে করতে নির্ধারিত স্কুলে ঢুকলাম। প্রিন্সিপাল আমাদের স্বাগত জানালেন। বসার ব্যবস্থা করে চা নাস্তা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি যখন বুরনাত ও অন্যান্যদের সাথে সীমন ও রবার্টোর ওয়ারশ থেকে আসার ব্যবস্থা নিয়ে আলাপ করছিলাম, প্রিন্সিপাল তখন চা নিয়ে এলেন। কিন্তু কথাবর্তা বলার ফাঁকে চাতে আর চুমুক দেবার সময় পাইনি। এরই মাঝে ঘণ্টা বেজে উঠলে সবাই নির্ধারিত ক্লাসের দিকে ছুটলেন। প্রিন্সিপাল নিজে আমার চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে বললেন যে আমি ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে আসছি।
আমাদের অষ্টম শ্রেণির একটি মাঝারি সাইজের ক্লাসে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি সামান্য কথা বলেই বুঝতে পারলাম যে ছেলেমেয়েরা সবাই ইংরেজি বোঝে। তবুও ক্যাতারজিনা আমার পাশেই বসলেন অনুবাদের জন্যে। এই ক্লাসে আমার সাথে আসা অন্য দুই কবির বাইরে কবিতা পড়তে আসলেন এন্থোনি, তিনি পোলিশ কবি হলেও ফ্যামিলি নিয়ে বসবাস করেন চেক রিপাবলিকে। তাঁর স্ত্রীও কবি, এবং এই স্কুলেই ইংরেজি পড়ান। ভেরা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করে প্রথমেই এন্থোনিকে কবিতা পড়তে আহ্বান জানালেন। তারপরে একে একে অন্যান্য কবিদের। ক্যাতারজিনা কানে কানে বললেন, “তোমাকে সবার শেষে ডাকবে।” আমি মনে মনে বললাম, “সেটাই ভালো!” যদিও ভেরা যে কবিতাগুলো তাঁর ভাষায় অনুবাদ করেছেন তা থেকেই একটা পড়তে হবে। কিন্তু আমি অনেকটাই দ্বিধাহীন ছিলাম যে আমার কবিতা শুনে ছেলেমেয়েরা বিপুলভাবে আপ্লুত হবে। অতএব আমাকে সবশেষে পড়তে দেয়াই ভালো। এবং হলোও তাই। আমি ‘এই হাত’ কবিতাটি মূল বাংলায় পড়লাম। ক্যাতারজিনা পড়লেন পোলিশ অনুবাদে আর ভেরা পড়লেন চেক অনুবাদে। অতএব আমার কবিতা অন্যদের থেকে একটি অতিরিক্ত ভাষায় পড়া হলো। এর পরে এলো প্রশ্নত্তোর পর্ব। প্রথমেই একটি ছেলে জানতে চাইলো, কবিদের প্রথমটি কবিতা লেখার অভিজ্ঞতার কথা। একে একে সব কবিই উত্তর দিলেন। দ্বিতীয় প্রশ্ন আপনার প্রিয় কবি বা লেখক কে বা কারা? প্রফেসর সারগেই অন্তত পঞ্চাশ জনের নাম উল্লেখ করলেন। ক্যাতারজিনা বললেন শুধু একটি নাম, পার্সি বিশি শেলি। আমার আর বুরনাতের নামগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকজন কমন পড়লেন, তবে বাংলা মুল্লুক থেকে সেখানে রবীন্দ্রনাথ স্থান পেলেন। আমি অবশ্য বাংলাদেশ, ভারত, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স এবং ইয়োরোপের বেশ কয়েকটি দেশের কবিদের নাম আলাদা আলাদাভাবে বললাম। এও বললাম যে একজন প্রাকটিসিং কবির শুধু একজনই প্রিয় কবি থাকেন না। পড়তে পড়তে সমসাময়ীকদের মাঝেও অনেকে প্রিয় হয়ে ওঠেন, যেমন আমার ডান পাশে বুরনাত আর বাম পাশে বসা ক্যাতারজিনা আমার প্রিয় কবি। তবে সব শেষে আমি লেখক হিসেবে কাফকার নাম বললাম, কারণ তিনি এমন কিছু সৃষ্টি করেছেন যা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। উদ্ভট সত্যকে তুলে ধরেছেন তিনি। কাফকা যেহেতু দীর্ঘদিন চেক রিপাবলিকে কাটিয়েছেন, জার্মানিতে জন্ম নিলেও তাঁকে চেক লেখক বলেই ধরা হয়। আমার কথা শুনে তাই ছেলেমেয়েরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো। ওদিকে ঘণ্টা পড়ে গেলে আমাদের বেরিয়ে যাবার পালা। কিন্তু আমি ছবি তোলার প্রস্তাব দিলাম। গ্রুপ ছবি সেলফি ইত্যাদি তুলে বেরিয়ে যাবার সময় একটি ছেলে এসে আমার অটোগ্রাফ নিলো। আরো দুইজন পরপর সেলফি তুলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো, বোহেমিয়ান মনেস্টারিতে পরে দেখা হবে।









