করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
আজকের সকালও তুমি সুন্দরভাবে শুরু করেছ। আয়েশি ভঙ্গিতে শরীরের আড়মোড়া ভেঙেছ। সুইট ড্রিমসের সুইট স্লিপিং স্যুটে বুকের অনাবৃত ভাঁজ আড়াল করতে করতে ঘুমন্ত রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসেছ, প্রিয় আইফোনে ফেসবুক নোটিফিকেশন চেক করতে করতে হিল্লি-দিল্লি করে বেড়ানো বন্ধুদের ছবি দেখে ঈর্ষাকাতর হয়েছ। তুমি ভ্রু কুঁচকে থাকলেও তোমার তর্জনী কিন্তু সোজা চলেছে, লাইক-লাভ-ওয়াও প্রতিক্রিয়ায় ভাসিয়েছে সবার সুসজ্জিত দেয়াল। কাঙ্ক্ষিত লাইক-কমেন্ট পেয়ে অন্যরাও সক্রিয় হয়েছে তোমার দেয়ালে। প্রতিমন্তব্য করার ব্যস্ততায় সহকর্মী সারোয়ারের বাবার মৃত্যুসংবাদে লাইক দেয়ার ভুলে জিভ কামড়ে ‘ইন্নালিল্লাহ’ লিখে সটকে পড়েছ। বিলেতফেরত কাজিন রাহাতের দুই লাখ ছাপ্পান্ন হাজার টাকার ফ্রিজের বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে তোলা ছবিগুলোতে বিরস মুখে লাইক দিয়ে বিড়বিড় করেছ, ‘ফকির ফুটানি মারে। দেশে ফিরে গিফট দেবার সময় বস্তাপচা সাবান-শ্যাম্পু ছাড়া তো কিছুই হাতে ওঠে না।’
ধর্ষণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাপাতির কোপ–এসব পোস্ট দেখে সসব্যস্ত হয়ে টাচ স্ক্রিন চেপে অন্যদিকে চোখ রেখেছ। বিছানায় শুয়ে থাকা রাজাকে রানির মতো নির্দেশ দিয়েছ, ‘নীলগিরি বা নীলাচল না, এবার বরফের দেশে, শুনছ সোনা, এই সামারেই! সপ্তাহদুয়েক আগে লোপা হাজব্যান্ডসহ ঘুরে এলো। কত ছবি যে দিয়েছে!’
রাজাবাবু রাতের উষ্ণতা ফিরে পেতে আয়েশি হাত বাড়িয়ে ‘হুম’করতেই তুমি কই মাছের মতো পিছলে গেছ, ‘আগে প্রমিস চাই, তারপর!’ পুনঃআবদারের ফুরসত না দিয়ে রাজা রানির ঘাড়ে উত্তাপ ছড়িয়ে আদুরে কণ্ঠে বলেছে, ‘ঠিক আছে জানু...এবার একটা টি টোয়েন্টি ম্যাচ হয়ে যাক।’ তুমি গ্রীবা উঁচিয়ে বলেছ, ‘ওইসব বিনিময় প্রথায় আমি নেই, যাচ্ছি।’ রাজাবাবু সাধের ঘুম খচে বিছানা ছেড়েছে, ‘যথাজ্ঞা, তাই হোক।’
অফিসে এসে তুমি সহকর্মীকে খোশমেজাজে আশু ভ্রমণ পরিকল্পনার গল্প শোনাতে শোনাতে তার ঈর্ষাকাতর দৃষ্টি উপভোগ করেছ। অফিস শেষে ব্যস্ত পায়ে বসুন্ধরা শপিংমলে গিয়েছ। না, ভ্রমণের শপিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় তো আছেই, এখন শুধু দমবন্ধ ভাব থেকে ব্যাগকে স্বস্তি দেয়াই তোমার উদ্দেশ্য। এরপর বসুন্ধরা শপিংমলের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফিসহ স্ট্যাটাস দিয়েছ, ‘ফিলিং এক্সাইটেড ফর দ্য নেকস্ট ট্রিপ উইথ মাই লাভ। হি ইজ দ্য গ্রেটেস্ট হাবি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড!’
এভাবেই সময়ের সঙ্গে দিনের উড়ে চলা। মিনিটের সঙ্গে টাকার হিসাবে রাজা আর রানির মতো তোমাদের জমাট সুখভাবনা বিচ্ছিন্ন করতে হঠাৎ ফেসবুকে এসেছে কিছু বেরসিক পোস্ট–‘সচেতনতা কাম্য, বৈশ্বিক মহামারি!’ এরপর থেকে রোজ বিষাদমাখা ছবি, ভিডিওগুলো আঙুলের স্পর্শে দ্রুত সরিয়ে দেয়া আর আফসোস, বেড়ানো হলো না!
ছুটির ঘোষণা হতেই ‘আজই বাজার করতে হবে, জানু, গাড়ি বের করো শিগগিরই...’ বলতে বলতে ছুটেছ দুজনে। যখন বাড়ি ফিরেছ তখন লিফটে জন আর জিনিসে সংকুলান হবার জো নেই। গেস্টরুমে ঠেসে মালপত্র তুলে নিশ্চিন্ত মনে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছ, ‘প্লিজ, স্টে অ্যাট হোম, স্টে সেফ…।’
হঠাৎ বিরক্তির উদ্রেক করেছে বন্ধুর ট্যাগ, ‘আশা করি তোমরা ফান্ড তৈরিতে সাহায্য করবে।’
‘সারা বছর দেশের কত মানুষ না খেয়ে মরে, কে কী করছে, যতসব ন্যাকামি’– তোমার শ্লেষ শুনে রাজাবাবু নির্বোধের মতো বলেছে, ‘কটা দিন আগে হলে বালি চুজ করতে পারতে।’ গলায় যুদ্ধের আভাস এনে তুমি রাজাকে ভর্ৎসনা করেছ, ‘বড় বাঁচা বেঁচেছি। এই বছর আর বেড়ানোর নাম মুখে না।’
তোমাদের সন্ধিতে ভাগ বসাতে উড়ে এসেছে রাজকন্যা, আদুরে গলায় বলেছে, ‘মাম্মি,আমাদের কান্ট্রিতেও কি আমেরিকা, ইতালির মতো হবে? করোনা এলে আমি কোথায় লুকাব?’ তুমি রাজকন্যাকে বুকে চেপে বলেছ, ‘এইখানে লুকাবে মাম্মি!’
তোমাকে অবাক করে রাজকন্যা রাগী রাগী গলায় প্রতিউত্তর দিয়েছে, ‘ইটস অ্যা বুলশিট মাম! ইউ ক্যান্ট সেভ মি!’
ভাবতে ভালো লাগছে এর পরের সকালও তুমি সুন্দরভাবে শুরু করেছ।