আশা

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnonameভোরের আলো ফুটতেই সুরুজ আলী ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। চারদিকে সুনসান নীরবতা, তবুও তাকে যেতে হবে। কোথায় যাবে নিজেও জানে না। গতরাতে মেয়েটাকে মায়ের হাতে মার খেতে হয়েছে, দুমুঠো ভাত বেশি খেতে চেয়েছে বলে।

বেসরকারি একটি অফিসে পিয়নের চাকরি করে সে। দেশে হঠাৎ করেই করোনা নামের এক ভাইরাসের ভয়ে সকলেই জবুথবু। সেদিন ম্যাডাম জরুরি ভিত্তিতে একটা স্যানিটাইজার আনিয়ে সবাইকে বললেন, যে যেখানেই যাও এসেই ভালো করে হাত ধুয়ে স্যানিটাইজার দিয়ে মুছে নেবে। স্যার ম্যাডামদের প্রায়ই বলাবলি করতে শোনা যায় সরকার এখনও কেন লকডাউন করছে না। এখনই না করলে ভাইরাসটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিছুদিন যাবতই চারদিকে লকডাউনের সুর শুনতে পাচ্ছিল সুরুজ। লকডাউন শব্দটির সঙ্গে সে একেবারেই পরিচিত নয়। সবাই বলছিল, অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যাবে কয়েক দিনের জন্য। এরই মধ্যে করোনা পরিস্থিতি যাতে বিরূপ আকার ধারণ না করে সেজন্য হঠাৎ করেই লকডাউনের ঘোষণা আসে। মনে মনে খুশিই হয় সুরুজ। কতকাল আয়েশ করে বাড়িতে থাকা হয় না। এবার যদি টানা কয়েকদিনের জন্য অফিসটা বন্ধ হয় তবে বাড়ি গিয়ে মনের সাধ মিটিয়ে কটা দিন থেকে আসবে। প্রতিবার বাড়ি গেলেই দৌড়ে চলে আসতে হয়। আর এখন তো ঈদ ছাড়া যেতেও পারেনা। তাও আবার একটা ঈদেই যাওয়া হয়। বাচ্চা দুটোসহ বাড়ি যাওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা না। যাওয়া-আসা বাবদ কতগুলো টাকা হাত গলে বেরিয়ে যায়। এজন্য বছরে ওই একবারই যায়। সে যাওয়াতেও দু-একটা দিন যে বেশি থেকে আসবে তাও পারে না অফিসের জন্য। খুব করে ইচ্ছা হয় মায়ের কাছে দুটোদিন বেশি থাকার। বয়সি মা, বাড়ি গেলে যে কী খুশি হন, চোখেমুখে খুশির দীপ্তি ফুটে ওঠে। সুরুজ ভাবে, আহ্ কতকাল মায়ের সঙ্গে গায়ে গা ঘেঁষে বসা হয় না। এসব ভাবতে ভাবতেই গাড়ি গন্তব্যে এসে পৌঁছায়। সরকার গতকাল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে ছাব্বিশ তারিখ থেকে টানা চার তারিখ পর্যন্ত। আগামীকাল অফিস হয়েই সারাদেশের অফিস আদালত টানা দশদিনের জন্য বন্ধ। তড়িঘড়ি করে বাস থেকে নামে সে। বেতনের চেক হেড অফিস থেকে নিয়ে যেতে এসেছে। ভালোই হয়েছে। বাড়ি যাওয়ার আগে আগে বেতনটা হয়ে গেল।

চেক নিয়ে শাখায় ফিরতে ফিরতে ব্যাংকের ট্রানজেকশন টাইম শেষ। কাল তবে জমা হবে। চিন্তায় পড়ে যায় সে। কাল জমা দিলে কি টাকা উঠাতে পারবে? মনে হয় না। পরে জানতে পারে জরুরি সার্ভিসের প্রয়োজনে সীমিত আকারে ব্যাংক খোলা থাকবে। একটু নিশ্চিন্ত হয়। অনলাইন সার্ভিস যেহেতু বাসার কাছের শাখা থেকেই উঠিয়ে নিতে পারবে।

এদিকে গত কদিনেও টাকা জমা হয়নি। প্রতিদিন একবার করে খোঁজ নেয়। আবার লকডাউনের কারণে গাড়ি চলাচলও বন্ধ। বাড়ি যাওয়ারও সুযোগ নেই। এভাবে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে বুঝতেই পারেনি সে। ছুটি যেদিন হয়েছিল সেদিন সবাইকে কেবল বাড়িমুখো দৌড়াতেই দেখেছে। ভেবেছিল বেতনটা উঠিয়ে আস্তে-ধীরে যাবে। কিন্তু সব তো বন্ধই হয়ে গেল। বেতন উঠাতে পারেনি বলে মাসের বাজারও এবার করতে পারেনি। অল্পকিছু যা ছিল সবই শেষ হয়েছে। থাকবে কেমনে? নতুন মাস ঢুকেছে আজ পাঁচদিন। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এই শহরে কেই বা তার আছে এই দুর্দিনে সাহায্য করার? বাড়ি যেতে পারলে হয়তোবা বাচ্চা দুটোর মুখে কিছু হলেও পড়ত। এসব ভাবনা সারারাতই ঘুমাতে দেয়নি তাকে। ভোরে ভোরে উঠেই তাই কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে।

টেলিভিশনে দেখাচ্ছিল কোথায় জানি চাল-ডাল দিচ্ছে, পায় কিনা সে আশাতেই পথে নামা। সকালের সোনারোদ সরে গিয়ে এবার চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ ছড়াতে শুরু করেছে। তীব্র গরমে হাঁটছে তো হাঁটছেই। মাথা ভনভন করছে আর হাঁটতে হাঁটতে না খাওয়া শরীরের দুর্বলতা আর রোদের প্রখরতায় মাথাটাও ধরতে শুরু করেছে। কোনোদিন ভাবেওনি এমন পরিস্থিতিতে পড়বে।

সামনে কয়েকজন মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। সুরুজের মনে একটু আশার সঞ্চার হয়। খানিকটা এগিয়ে যেতেই দেখা যায় কয়েকজন লোক সাদা পলিব্যাগে কিছু চাল-ডাল বিলি করছেন। লজ্জা, জড়তা, অস্বস্তি সব জলাঞ্জলি দিয়ে সুরুজও লাইনে দাঁড়িয়ে যায়, যদি সামনের ১২-১৫ জনের পরে তার ভাগ্যে একটা ব্যাগ জোটে সেই আশায়।