রুনু

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে।  সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই।  আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnonameসেই থেকে রুনুর মনের ভেতর কেমন একটা উথাল-পাথাল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। যাবেই তো! মাত্রই কলেজ যাওয়া তরুণীর হাতে একটা কবিতা এসেছে। তারই কলেজের ইংরেজির অধ্যাপকের কাছ থেকে। তাও আবার তাকে নিয়েই লেখা। রোমান্টিক কবিতা। রুনু একবার এঘরে একবার ওঘরে গিয়ে গোপনে কবিতাটা বের করে পড়ে আর মুচকি মুচকি হাসে। কবিতাটা দেয়ার সময় স্যার বলেছিল, ‘বিকেলে বাসায় এসো। টেন্সটা দেখিয়ে দেব। তাছাড়া তোমার ভাবীর সঙ্গেও দেখা করে যেও।’ স্যার আর রুনুদের বাড়ির দূরত্ব ধর্মের মতো একটা কালো পিচ করা মোটা রাস্তা দিয়ে ভাগ করা। স্যার রাজনীতির পাওয়ার প্র্যাকটিস করে বলে তার কবিতা লেখা কিংবা এইসব ফুলের প্রতি আনুগত্যকে সকলেই তার শিল্পী মনের পরিচায়ক হিসেবে দেখে। এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার পর সকল গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া স্টুডেন্টদের হাতে পুরস্কার হিসেবে এই স্যারই তো একটা করে মোবাইলফোন উপহার দিয়েছিল! তাও নিজের টাকায়! রুনুর হাতে দেবার সময় স্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়াও করেছিল। সকলকে দেখিয়ে বলেছিল, এই মেয়ে একদিন অনেক দূর যাবে। অন্যরাও স্যারের কথায় মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়েছিল।

একদিন অনেক রাতে স্যার ফোন করে রুনুকে। ‘কিচ্ছু ভালো লাগছে না। কী করি বলো তো রুনু?’ স্যার কী ড্রিংকস করেছিল? স্যারের কথার অসংলগ্নতা রুনুকে ভয় পাইয়ে দেয়।

সেদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় স্যার হঠাৎ করেই সকলের সামনে রুনুকে তার রিকশায় ফেরার অফার করে। এসবকে স্যারের পিতৃত্বসুলভ আচরণ হিসেবেই দেখে বলে কেউ আর অবাক হয় না। একদিন সরস্বতী পূজায় স্যার বিনা দাওয়াতেই রুনুদের বাসায় এসেছিল প্রসাদ খেতে। রুনুর বাবা-মা খুব খুশি হয়েছিল স্যারের এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাবে। রুনুও। ওহো, বলা হয়নি, এর মাঝে স্যার প্রায় প্রতিদিনই রুনুকে নিয়ে কবিতা লিখত আর গোপনে ওকে দিত। রুনুর এতে অস্বস্তি হতো ঠিক, তবে ভালোও লাগত। কখনো কখনো এসব নিয়ে আলাপে আলাপে তারা ঘুরে আসত অজস্র মেহগনি বন, অনেক অনেক নদীর পাড় আর গমক্ষেত! সেসব কথা এখন আর রুনুর স্পষ্ট মনেও পড়ে না। রুনুকে স্যার বলত তার দেখা সবচেয়ে ম্যাচিউরড মেয়ে। রুনুর এতে গর্ব হতো খুব। শুরুর দিকে স্যারের যে কোনো কারণে মন খারাপ হলেই রুনুকে ফোন দিত। ফোনে এই কথা সেই কথা, এই গান তো সেই আবৃত্তি...চলতেই থাকত। রাত যত গভীর হয় একটু একটু করে রুনুর বয়স বাড়তে থাকে। অধিকাংশ সময় তাদের শেষটা হতো গিটারের তার ছিঁড়ে যাবার মতো ঝংকার তুলে। সমস্ত রাত আর রুনুর ঘুম হতো না।

পরদিন সকালে কলেজে গিয়ে দেখা যেত রাগী রাগী চেহারা নিয়ে স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। খুব কড়া কড়া কথা শুনিয়েছিল সেদিন। একদিন বলেছিল, পাহাড় দেখাতে নিয়ে যাবে। একদিন নদী আর জল। বলেছিল, দেখবে, জলে অনেক সাপ থাকে।

রুনু আর কথা বাড়ায়নি। এখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। নতুন নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ, নতুন ফোন, নম্বরও নতুন। তবু কোথাও যেন রুনু খুব বিষণ্ন হয়ে থাকে। স্যার কি এখনও ফোন করে? কী জানি!

সেদিন একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন।

‘হ্যালো?’

রুনুর মুখটা শুকিয়ে যায়। আরও বিষণ্ন আর বিধ্বস্ত দেখায়। চোখটা ছলছল। শুধু মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হয়—আচ্ছা।

আজ সোমবার। সাদা একটা মাইক্রোবাস এসে থেমেছে ক্যাম্পাসের গেটে। স্যারের সাগরেদ ইউসুফ আর স্বপন ভেতর থেকে গেটটা খুলে দেয়। রুনু কোনো কথা না বাড়িয়ে উঠে বসে। মাইক্রোবাসটি চলনবিলের ভেতর দিয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটতে থাকে। বিলের ভেতর যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। শুধু সাদা। জলের ধু ধু। রুনুর মনে প্রতিধ্বনির মতো বারবার ফিরে আসছে—জলে অনেক সাপ থাকে! সাপ থাকে!!

মেয়েটা সত্যিই আজ অনেক দূরে যাচ্ছে। অনেক অনেক দূরে। কতটা দূরে—জানা নেই তার।