করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
হারেসের মা মুখ বেজার করে সালেহাকে তাগাদা দেয়—ছালাইয়া চুলা ধরাও, সহালের রান্ধাবাড়া করো। তুমার তো মন ভরে না সারা দুইন্যাডা আইন্যা দিলেও। জামাইর ঘর ভালা না লাগলে বাফের বাড়িত যাওগা! দুইডা দিন থাইক্যা দ্যাহো বাফের বাড়ি ক্যামন মজা লাগে! সালেহা কোনো উত্তর দেয় না। মরিচমাখা হাত চোখে লাগলে যেরকম জ্বালা করে সেরকম তার ভেতরটা জ্বালা করতে থাকে শাশুরির কথায়। নিজের রাগ কমানোর জন্য কোনো কারণ ছাড়াই ঠাস করে ক্লাস টুতে পড়া তার ছেলের পিঠে দুই ঘা বসিয়ে দেয়—গুলামের পুত, মুখ দিয়া আওয়াজ বাইর কইরা পড়। আমার সামনে নিজিমরার লাহান পড়িছ না।
ঘটনার আকস্মিকতায় ছেলেটা হতভম্ব হয়ে যায়। সে কান্না করতেও যেন ভুলে যায়। বুঝতে পারে, দাদিরসঙ্গে মায়ের একটা কিছু হয়েছে। কেননা সে প্রায়ই দেখে দাদির সঙ্গে মায়ের ঝগড়াবিবাদ লেগেই আছে। এই কারণে মাঝেমধ্যে সে এই বুড়ির ওপরও বেশ বিরক্ত হয়।
সকাল দশটা বাজে। হারেস কলতলা থেকে হাতমুখ ধুয়ে ঘরের বারান্দার বেঞ্চিতে বসে। প্রতিদিন এমন সময়েই সকালের ভাত-তরকারি হয়ে যায়। কিন্তু আজ সেরকম কোনো আলামত দেখতে না পেয়ে সে নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে ঢুঁ মারে। সালেহা মুখ কালো করে চুলার সামনে বসে আছে। লাউয়ের তরকারি চুলার ওপর গলগল করে সিদ্ধ হচ্ছে। হারেসের মেজাজ বিগড়ে যায়।
—অহনো রান্ধাবাড়ার খবর নাই। সহালের ভাত কি যোহরের ওয়াক্ত খাওন লাগব?
—আরেকটা হাঙ্গা কইরা লইলেই তো অয়। হেই বেডি সময়মতো রাইন্দা খাওয়াইব।
—অত বিরগিজ্বালা কথা কইয়ো না।
—তুমার মারে কউ রাইন্দা খাওয়াইবনে তুমারে। খালি তো সারাডা দিন আমার খুঁত ধরনের লাইগ্যা আছে!
—তুমারে কতদিন কইছি আমার মার কুনু বদনাম আমার সামনে করতা পারতা না। কিছু অইলেই আমার মার দুষ।
—উঠতে বইতে তুমার মা আমারে তাগাদা দেয় আমার বাফের বাড়ি তো দুই লাখ ট্যাহা আইন্যা তুমারে দিতাম। আমার বাফের বাড়িত কি ট্যাহার গাছ আছে? আগেরবার মুদি দোহানের লাইগ্যা তিরিশ হাজার আইন্যা দিছি। তুমি হেই ট্যাহার হিসাব দ্যাও।
—দোহান যে লস অইছে হেইডা কি তুমি জানো না? অহন চাইতাছি একটা অটোরিকশা কিইন্যা নিজেই চালাইয়াম। সংসার তো চালানি লাগব।
—মরার সংসার চালাইতাছে। সারাডা দিন সেতুর বাজারো আড্ডা মারে আর বাতুরবানের লাহান ঘুরে! এইডারে কয় সংসার চালানি!
হারেসের মাথায় আগুন ধরে যায়। দুই পায়ের স্যান্ডেল এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। হনহন করে হেঁটে সোজা শেফালিদের বাড়ি গিয়ে ওঠে। এই শেফালির সঙ্গে একসময় হারেসের প্রেম-ভালোবাসার মতো অনেককিছুই ছিল। বিয়েশাদি হলো তকদিরের বিষয়। তাই হারেসের তকদিরে ছিল না বলেই শেফালির সঙ্গে তার বিয়েশাদি হয়নি। শেফালির বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসির সঙ্গে। তার জামাই তিন বছর পরপর বিদেশ থেকে একবার আসে দেশ গেরামে। শেফালির ছেলেমেয়ে নেই। জামাইয়ের বাড়ি না থেকে সে নিজের বাপের বাড়ি থাকে।
শেফালি আইনত অন্যের বউ হলেও হারেস তার ওপর আগের সম্পর্কের টানে এক ধরনের অলিখিত অধিকার খাটায়। সেটা শেফালি বোঝে। আর বোঝে বলেই সেও হারেসকে দূরে ঠেলতে পারে না। এক অনিবার্য নিয়তির মতোই হারেস আর শেফালি সময়-সুযোগ পেলেই একে অন্যের কাছে আসে, আর চাহিদা মেটায়। অদেখা যে টান দুজনের হৃদয়ের গভীরে প্রবাহিত হচ্ছে, সেটা উপেক্ষা করার শক্তি তাদের দুজনের কারওই নেই। হারেসের পাতে পরম মমতায় শেফালি ভাত তুলে দেয়। শেফালি যখন কিছুটা ঝুঁকে এসে তার পাতে ভাত দেয় তখন শেফালির শরীর থেকে অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ হারেসের নাকে লাগে! সে ভেতরে ভেতরে অন্যরকম হয়ে যায়! সে মুখ তুলে শেফালির দিকে তাকিয়ে হাসে আর চোখের ইশারায় কী যেন বলে, যেটা শেফালি ঠিকই টের পায়!
টের তো পাবেই, ভেতরে ভেতরে যে এক গভীর টান বয়ে যাচ্ছে!