করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
‘আম্মা, দুফর অইছে না? ভাত খাইতাম না অহন?’ বাদামি রং চোখগুলো ওর ছোট হয়ে আসে রোদের চাপে, দৌড়ে এসে টুনি বসে পড়ে মার কাছে। বোধহয় হাজেরা শুনতে পায়নি। আবার টুনি চড়ুই চিঁ-চিঁ করে ওঠে, ‘ও আম্মা, অহনও দুফর অইছে না? ভাত খাইত ডাক দেয় না কা?’
হাজেরা বেগমের মন চায় ঠাস করে একটা চড় বসাতে টুনির গালে। দিতে গিয়েও পারে না, চিলের মতো তীক্ষ্ণ রাগটা শাঁ করে আসে, শাঁ করেই পড়ে যায়, মেয়েটার বাদামি চোখ দুটোর দিকে নিশ্চুপ চেয়ে দেখে ও। কথা খুঁজে না পাওয়ার জন্য না ঠিক, মেয়েটাকে ক্ষুধা ভুলিয়ে রাখার জন্য বলে, ‘টুনিইইই, দৌড় দে লো মা, দৌড় দে। হুসসসস্, লড়াইয়া দে, মরার কইতর!’
টুনি ছোওওও করে উড়ে যায়, তিড়িংবিড়িং করে কবুতর ভাগায়। ফড়ফড় ফড় পত পত পত উড়ে যায় সারি সারি কবুতর। আবার গিয়ে বসে আরেক পাশে। চাঁদিফাটা রোদে মাথাল মাথায় দৌড়ে দৌড়ে পাখি তাড়ায় মেয়ে-ছেলের দল সব, টুনিও।
‘আম্মা, আজানও তো দিয়া দিল, দুফর অইছে না? আমার ভোখ লাগছে...’
এবার রাগে না হাজেরা। মেয়েটাকে কাছে টেনে বলে, ‘রয় মা রয়। সেলি খাইয়া আসুক, অয় আইলেই আমডা যামুখন।’
টুনির দেরি সয় না। মনে মনে সেলিকে বিস্তর গাল পাড়তে থাকে। মাগিটার হোঁদল কুতকুত পেটভাসা শরীরটা কেমন করে এক ঠ্যাং মেলে বসে মুঠা মুঠা ভাত খায় এটা ভেবে রাগ হয় । হঠাৎ মাঝরাতে মাকে বিছানায় পেত না যখন, নিয়ম করে খুঁজতে গিয়ে পাশের পলিথিনের বেড়ার বাঁধ ভেঙে হুটোপুটি আর মায়ের সঙ্গে অচেনা কোন পুরুষ গলায় গালির বন্যা ভেসে আসে, সেখান থেকে গিলে নেয়া সবকয়টা গালি সেলিকে উগড়ে দিয়েও টুনির পেট জ্বলা বন্ধ হয় না।
এবার একটা স্বর্গীয় ডাক আসে। ডাকটা সেলিই ডাকে, ‘ওই হাজু, ভাত খাইতে যা, আমি বইলাম অখন।’
সব ছবি নিমেষে পালটে যায়। টুনি মার দিকে চেয়ে চকচকে চোখে শুকনো ঠোঁটে আকর্ণ হাসি হাসে।
একলাফে শরীর চাঙ্গা হয়ে ওঠে মা-মেয়ের। সেলির ওপর সব রাগ কর্পূর হয়ে যায় টুনির। দুজনেরই তখন চক্ষু কর্ণ নাসিকা বিস্ফারিত হয়ে কুকুরের মতো শুঁকতে শুঁকতে যেতে থাকে খাবার ঘরের কাছে—ভাতের সঙ্গে আজ কী সালুন? ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তির তির করে ‘আইজ ভাগে মাছ আছে তো?’
মা বেটি মাথাল না খুলেই দৌড় দেয়, হুটোপুটি করে মাথাল খুলে রেখে আসে। চাটাইয়ে ভাতে ঝোলে মাছের কাটায় মাখামাখি। স্টিলের গ্লাসে কারও ভাত-তরকারিমাখা হাতের ছাপে। কালির দাগপড়া আধময়লা মেলামাইনের দুটো বাসন কোনোমতে হাজেরা ধুয়ে নিয়ে একটা ধরিয়ে দেয় টুনির হাতে। বড় ডেকচির সামনে ওরা বাসন পাতে, এক হাতায় ভাত, আরেকটায় তরকারি।
টুনি চিঁ চিঁ করে ওঠে—‘আমারে মাছ দ্যান নাই।’
হাতাধারী বশিরের ভুঁড়ি নেংচে ভয়ংকর কেঁপে ওঠে—‘একজনের খাওনে মা বেটি দুইজন, আবার মাছ! চল ফুট...’
ভাতওয়ালা চ্যাংড়া মালেক খেক খেক করে হাসে, ‘মিয়া দুইজন না, দেড়জন কও।’
বশির নোংরা হাসিতে চোখ নাচায়—‘মা মাগিটারে দেখ, একাই তো দুইজন।’
হাজেরা আজন্ম ক্ষুধা জর্জর কর্কশ স্বরটা মোলায়েম করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে—‘দেও না বশু ভাই, মাইয়্যাডা...’
কথা শেষ হতে দেয় না বশির। খেঁকিয়ে ফ্যাস ফ্যাস করে বলে—‘ক্যান লো, তোর মোছলেম ভাতার সব দিবার পারে না নাকি?’
হাজেরা আর কিছু বলে না। অতকিছু কানে তোলার সময় নেই এখন। গপাগপ ভাত-সালুন চালান দেয় পেটের গভীর কুয়োয়। ধুধু মরু পানি শুষে নেবার মতো মুহূর্তে সব ভাত উধাও। মেয়েটাকে হাজেরা বলে—‘পানি খা মা, ভাত খাওনের পরে বেশি কইরা পানি খাওন লাগে।’
টুনি ঝটকা মেরে হাজেরার হাত সরিয়ে দেয়। যেন ভাগে মাছ না পাওয়ার সব দোষ হাজেরার!
দুবেলা ভাত-সালুন, সকালে উপোস মা-বেটির। রোজ রোজ দুপুর হবার জন্য তাই টুনির এত তাগাদা। নিজের না খাওয়া তবু সয়, টুনির না খাওয়া হাজেরাকে বেশি পোড়ায়। ঘুমচোখ ওর অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে। স্বামী নেই, ঘরনেই, কিছুইনেই। মাঝেমধ্যে তো মনে হয় টুনিটা না থাকলেও মন্দ হতো না। কেয়ারটেকার মোছলেমের সঙ্গে আখের গোছাতে পারত। টুনিসহ সে হাজেরাকে নেবে না। হাজেরাও হার মানে না। তবু খালাস হয় না হারামজাদা, খল্লায় কাজ জুটিয়ে দেয়ার অজুহাতে মাঝে সাঝে হাজেরাকেও লাগে তার। কখনো এটা সেটা দেয়, এই যা! আর কোনো লাভনেই। একটা স্থায়ী ব্যবস্থার ভাবনা ভাবতে থাকে হাজেরা।
রোজ দুবেলার এই খাওয়াটা মা-মেয়ে দুজনের বাস্তব আর স্বপ্নকে সাপের মতো জড়িয়ে রাখে। রাতে ঘুমানোর সময়ও টুনির চিঁ চিঁ শোনা যায়।
—আম্মা।
—হুউ।
—ও আম্মা।
—কী অইছে।
—কাইলকা কী রানব বশিরায়?
—আমি কী জানি।
- সেলিরে জিগাইতে পারো না?
- তুই জিগাইছ
—হুউউ, আমারে দেখলেই হেতি খেক খেক করে।
—ঘুমা অখন।
হাজেরার চোখ লেগে আসে। বিরাম দিয়ে আবার টুনির চিঁ চিঁ চলতে থাকে ফের।
—আম্মাগো।
—হুউউ।
—কাইলকা বশিররে কইবানি আমারে মাছ দিত? তরকারি কম দেক, একটা মাছ আমি আর তুমি বাট কইরা খামু...
কইবানি গো?
ও আম্মা।
অন্ধকারে হাজেরা উঠে বসে। ঠাস করে একটা চড় দেয় টুনির গাল বরাবর।
—চুপ, এক্কেরে চুপ হারামজাদি। ঘুমা, না ঘুমাইলে আরও একটা দেমু অখন।
এবার টুনির চিঁ চিঁ বন্ধ হয়। একটু সময় পর ওর ভারী নিঃশ্বাসের আওয়াজ শোনা যায়। হাজেরা গায়ের কাপড়টা টেনেটুনে গুছিয়ে ছেঁড়া কাঁথাটা মেয়েটার গায়ে চাপিয়ে ছাপড়া থেকে বের হয়। মেয়েটাকে মেরে মনটা দমে গেছে। ঘুমানোর আগে চড়টা না মারলেও হতো।
থাক, এত ভাবাভাবির কিছু নেই। কাল দুপুরেই সব ভুলে যাবে মেয়ে। ঘুম-তাড়ানো চোখ কয়েকবার আঁচলে কচলে এদিক ওদিক দেখে নেয়। না, খল্লার চারপাশের সব ছাপড়া ঘুমিয়েছে। হাজেরার পা দুটো টলমল করতে করতে বশিরের ছাপড়ার দিকে এগোয় এবার।