করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
কেমন যেন চারপাশে সব সরে যায় জানিস৷ সেসব দিন যেভাবে সরে গেল। এই তো এরকম চৈত্র দিনে কড়ালি আম কুড়াতাম তোর মনে আছে। সেই যে খাঁয়েদের বাগান থেকে৷ তারপর হাতের তালুতে লবণ নিয়ে। অতি সাধের ছোট চাকুখান দিয়ে ক্ষেতের আলে বসেই সেই আম খেতাম। সেই চাকুটাও হারিয়ে ফেলছি! সেই দিনও।
পড়াশোনা শেষ করে, তুই গ্রামে থেকে ভালোই করেছিস। সরকারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করছিস। বেশ ভালো। আমি শহরে পড়তে গিয়ে যে কত কাজ করেছি তার ইয়ত্তা নেই। ধর হোটেল বয় সার্ভিস বয় থেকে ঠ্যালাওয়ালার জমাদার কী করিনি। আসলে লোকে বলে কাজকে কাজ মনে না করলে জীবনে উন্নতি হয় না। বিশ্বাস কর, কোনো কাজকে ছোট মনে করিনি কখনো। কই আমার আর উন্নতি হলো কই!
মহামারি লেগেছে। দেশের পর দেশ আক্রান্ত। আমার সর্বশেষ চাকরিটা চলে গেছে। দু’মাস আগে। ট্রাভেল এজেন্সির টিকিট বেচার দালালি করে টেনেটুনে দুই সন্তান আর স্ত্রী চারজনের সংসার চালাচ্ছিলাম। আর আরেকটা চাকরি খুঁজছিলাম। এর মধ্যেই মহামারি। তাই বাধ্য হয়েই গ্রামে এলাম। এ গ্রামে আমি কী করে খাবো বল। এ গ্রাম আশ্রয় দিয়েছে আমায়, কিন্ত খাদ্য তো দেয় না কেউ। আমি শহরের অফিসার ত্রাণের ব্যাগ আমার বাড়ি পর্যন্ত আসে না রে।
মঞ্জু এত মন দিয়ে কথা শুনতে পারিস বলেই হয়তো শিক্ষকতা পেশায় ভালো করেছিস। যে মন দিয়ে শোনে সেই বলতে পারে ভালো। সেই জিতে। জিতবার পর তার অতীত সংগ্রাম হয়ে ওঠে কাব্যিক আর মহান। আর পরাজিতের গল্প কেউ শুনতে চায় না। এ পর্যায়ে এসে জামালের কাঁধে হাত রাখে শিক্ষক মঞ্জু আকন্দ, বলে—‘ওরে থাম, আমি তোর জন্য কিছু করতে পারি কিনা দেখি।’ সহাস্যে তা উড়িয়ে দেয় জামাল—‘হা হা হা, তুই কী দেখবি, হে হে হে আমি সব জানি। তুই সব জেনেও কিছু বলতে পারবি না। চেয়্যারম্যান সাব তোর আপন মামাশ্বশুর৷ তার চুরির চালের গুদামে কি আর তোর হাত যাবে।’ মঞ্জু মাস্টার কিছু বলে না, তাকিয়ে থাকে বাল্যবন্ধু জামাল মিয়ার মুখের দিকে।
শোন মঞ্জু, আমাকে কয়েক’শ টাকা ধার দে। শহরে যাব। চাকরির অফার আসছে। খুব ভালো চাকরি। শহরে যে মানুষ মরছে, তাদের দাফন-কাফন করবার লোকের অভাব। আমাদের ট্রাভেল কোম্পানিটা তাদের নাম চেঞ্জ করে ‘বাই ফর এভার’ নামে দাফন-কাফনের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি খুলেছে। যে রোগে মানুষ মরছে তা বড় ছোঁয়াচে। মৃতের কাছে কেউ আসতে চায় না। তাই উচ্চ বেতনেই চাকরিতে যাচ্ছি। পকেটে হাত ঢুকিয়ে তিনশ টাকা বের করে জামালকে দেয়। দোয়া করিস বন্ধু। মহামারিটা আরও কিছুদিন যেন থাকে। আসি রে বন্ধু...!
ফজর নামাজের পর জামালের জানাজা হয়েছে। চেয়ারম্যান সাব নিজ উদ্যোগে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্ত প্রশাসনের লোকরাই সব করলেন। চেয়ারম্যান সাব এক বস্তা চাল পাঠিয়েছেন মঞ্জু মাস্টার সেই চাল পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। জামালের নতুন কবরটার দিকে চোখ পড়তেই ভেতর থেকে কেমন যেন ভেঙে এল, বাই ফর এভার, বাই ফর এভার।