করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
—ছবি ফেসবুকে আছে। ওখান থেকে দেখান। আধঘণ্টা পর আবার বড় খালার ফোন।
—এসব মলিন শার্ট, ময়লা প্যান্টের ছবি দিলে হবে না। কোট-টাই পরা স্মার্ট ছবি পাঠা।
কোট-টাই রানার নেই। মাস্টার্স পাস করে আপাতত বেকার। যে কোনো একটা চাকরি খুঁজছে হন্যে হয়ে। এক ধরনের আত্মবিশ্বাস, অহংকার ছিল প্রথম প্রথম। কয়েকটা জায়গায় রিটেন-ভাইবার পর ধসে পড়েছে তাও। এসময় বড় খালার প্রস্তাবটা লুফে নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প দেখছে না সে।
মেয়ে আমেরিকা থাকে সপরিবারে। বড় খালাদের পাশের ফ্ল্যাটে। মেয়েরা চাচ্ছে, শিক্ষিত, মার্জিত, ফ্যামেলি ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো এলাকারই একটা ছেলে। বিয়ের পর ছেলেকে মেয়েই নিয়ে আসবে আমেরিকায়। ওখানকার ছেলেদের ওপর বিশ্বাস নেই মেয়ের বাবার।
এমন সুযোগ বারবার আসে না। লোভে চকচক করে উঠল চোখ। বাবার পেনশন আর নিজের টিউশনের টাকা দিয়ে বাড়িভাড়া, পরিবারের খরচ, ছোট ভাইদের পড়াশোনা চালানোটা বড় কষ্টের। একবার পাড়ি দিতে পারলেই দৃশ্যপট পাল্টে যাবে।
কোট-টাই কোথায় পাবে সে? দু-একজন কাছের বন্ধু যারা আছে ওদেরও এসব নেই। একটা ছবি তোলার জন্য নতুন কোট-টাই কেনার কোনো মানে হয় না। বিকল্প রাস্তা একটা অবশ্য আছে।
কম্পিউটারের দোকানে যেতেই সমস্যার সমাধান হলো। একটা ছবি তুলে দোকানদার ক্যাচ করে মাথা থেকে শরীরটা ফেলে দিল রানার। রক্ত বেরুলো না এক ফোঁটা। তবুও চমকে উঠল সে। শরীর ছাড়া শুধু মাথাটায় ভয়ংকর দেখাচ্ছে ওকে। স্ক্রিনে কয়েকটা শরীরসুদ্ধ জামা এনে দোকানদার বলল, কোনটা পছন্দ আপনার?
রানা উত্তর দিল না কোনো।
লোকটা মেরুন রঙের শরীরসুদ্ধ জামাটা কোট-টাইসহ রানার গলার নিচে বসিয়ে দিল।
এমনিতে রোগা লিকলিকে সে। কী আশ্চার্য, আরেকজনের সুগঠিত শরীরে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। রোদে পুড়ে মুখটা একেবারে কালচে হয়ে গেছে। চোয়ালটা গর্তের মতো দেখাচ্ছে। মাউস টিপে টিপে মাংস এনে চোয়ালটা ভরাট করল লোকটা। ঝামা পাথরের মতো কারসর দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে ফেলল সবগুলো দাগ।
ছবিটা স্ক্রিনে দেখে গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল রানা। ভাবতে লাগল মেয়েটার কথা। যতটুকু সে শুনেছে, মেয়ে শ্যামলা, মাঝারি সাইজের, শিক্ষিত। লটারি জিতে কয়েক বছর আগে সপরিবারে আমেরিকা গেছে। একটা জুতার দোকানে চাকরি করে এখন।
ছবিটা দেখে মেয়েটার হয়তো পছন্দ হবে। কিন্তু বাস্তবে যখন সামনে আসবে তখন? অপরাধের লজ্জায় নিজের ভেতর কুকড়ে যাচ্ছিল সে। নির্মম বাস্তবতার যে ঘোরটেপে পড়ে আছে সে এখান থেকে বের হতে এটা ছাড়া ভিন্ন কোনো সুড়ঙ্গ নেই সামনে। ছবিটা মেইলে খালার কাছে পাঠিয়ে দিল সে।
মেইল পেয়েই বড় খালার ফোন, দারুণ ছবি হয়েছে। এক দেখাতেই পছন্দ হবে কনে পক্ষের। আর শোন, মেয়ের একটা ছবিও পাঠিয়ে দিচ্ছি দোকানদারকে। নিশ্চিত তোর পছন্দ হবে।
চা খাওয়ার নাম করে দোকান থেকে বেরিয়ে এল রানা। মেয়েটার ছবিও মেইলে চলে এসেছে এতক্ষণে। মেয়েটা কি আসলেই মেয়েটার ছবি পাঠিয়েছে? নাকি অন্য কাউকে দিয়ে ফেলা হাত, ঠোঁট, বুক আর অদৃশ্য হৃদয়ের ছবি পাঠিয়েছে ওকে? সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগল মনে। দোকানে ফিরে গেল না রানা। ছবিটা না দেখেই বাসায় ফিরে এল সে। একটা মুখোশ পরে আরেকটা মুখোশ দেখার কোনো ইচ্ছে তার নেই।