পুলিশের ‘ক্রসফায়ার’ কৌশলে ক্ষুব্ধ ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা

১৪ দলীয় জোটসন্ত্রাস ও গুপ্তহত্যা নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশের ‘ক্রসফায়ার’ কৌশলে ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা। তবে এই নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্য পাওয়া গেছে। ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর কয়েকজন নেতার মতে, সর্বশেষ জঙ্গি বলে অভিযুক্ত মাদারীপুরে জনতার হাতে আটক ফাহিম ও ব্লগার অভিজিৎ হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক শরীফকে ‘ক্রসফায়ার’ দিয়ে পুলিশ জঙ্গি ও সন্ত্রাস নির্মূলে ১৪ দলীয় জোটের যে ‘জিরো ট্রলারেন্স’ নীতি রয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শুধু তাই নয়, এই দুটি ‘ক্রসফায়ার’ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনগণের ভেতরে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
শরিক দলের নেতারা বলেন, জোটের বৈঠকে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব। সরকারের কাছেও ১৪ দলের পক্ষ থেকে একটি পরামর্শ দেওয়া  হবে। জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের উৎসমূল খুঁজতে হলে অপরাধীদের ধরে তথ্য উদঘাটন করতে হবে। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে আড়ালেই থেকে যাবে এ সবের উৎসমূল। সম্প্রতি ‘ক্রসফায়ার’ পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের  আচরণ নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের ভেতরে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তারা ইস্যুগুলো নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধও।  
১৪ দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সরকারের বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সংসদে বাজেট বক্তৃতায় পুলিশের ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ক্রসফায়ারের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনই দেখছি ক্রসফায়ারে জঙ্গি নিহত হচ্ছে। ক্রসফায়ার জঙ্গি সমস্যার সমাধান নয়। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এর মধ্য দিয়ে তাদের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সন্ত্রাস-জঙ্গি নির্মূল আমাদের জোটগত অঙ্গীকার। তবে সন্ত্রাস বা জঙ্গি নির্মূলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেরও বিরুদ্ধে আমরা। আমরা মনে করি না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ জঙ্গি নির্মূলে কথিত ক্রসফায়ারে কোনও সুফল আসবে। আমরা মনে করি জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে  দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি  দেওয়াই  উত্তম।

জাসদ (আম্বিয়া) সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, ফাইয়াজ নামের এক জঙ্গি অপরাধ করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়েছে। প্রথম কোনও জঙ্গি ধরা পড়ল। তাও পুলিশ ধরতে পারেনি। ধরেছে জনতা। দুই দিন বাদে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ফাইয়াজ। পুলিশের এই ঘটনায় সবার মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে। পুলিশকে এসব ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। শরীফ নামে আরেক জঙ্গিকেও ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়া হয়েছে। এগুলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনের যে দৃঢ় প্রত্যয়, তা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

জাসদ (ইনু) সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তার বলেন, ১৪ দলীয় জোট সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে জিরো ট্রলারেন্স প্রদর্শন করে আসছে শুরু থেকে। তবে জঙ্গি দমনে পুলিশের ‘ক্রসফায়ার’ সঠিক পথ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগে খুঁজে বের করতে হবে এর উৎস মূল। সর্বশেষ ফাহিম ও শরীপের ক্রসফায়ারের ঘটনা আমি মনে করি উৎস মূল বের করার পথ নষ্ট করেছে। এসব ব্যাপারে পুলিশকে আরও সতর্ক হতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুর রহমান সেলিম বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাস নির্মূলে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে আমার আপত্তি আছে। সন্ত্রাস-জঙ্গি নির্মূলে আগে পুলিশকে বের করতে হবে তাদের গডফাদার বা হোতা কারা? এরজন্যে পুলিশকে আরও সিরিয়াস হতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষককে হত্যার সঙ্গে জড়িত জনতার হাতে আটক ফাইয়াজ হতে পারত জঙ্গিদের গডফাদার বা হোতা খুঁজে বের করার একটি পথ। ফাহিমকে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার পরে পুলিশের সদিচ্ছা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাস নির্মূলে পুলিশকে আরও দুরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পুলিশ নিজেদের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তিনি বলেন, এসব বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে নিশ্চয়ই ১৪ দলীয় জোট আলোচনা করে সরকারকে একটি পরামর্শ দেবে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস নির্মূলে পুলিশের ব্যর্থতা সরকারের জিরো ট্রলারেন্স প্রত্যয়কে বাধাগ্রস্ত করবে।    

/এমএনএইচ/ আপ- এপিএইচ/

আরও পড়ুন:
জঙ্গি দমনে ‘বন্দুকযুদ্ধ’-‘ক্রসফায়ার’, দ্বিমত পুলিশেই

আড়ালেই থেকে যাচ্ছে ‘ক্রসফায়ারে’র মূল গল্প

ক্রসফায়ার এবং ক্রসচেক

‘ক্রসফায়ার’ চলুক, ‘ক্রসফায়ার’ বন্ধ হোক!