সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৭ জানুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বর্তমান সরকারের তিন জন টেকনোক্র্যাট ও তিন জন প্রতিমন্ত্রী ছাড়া বাকি সবাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীরা পদত্যাগ করে দফতর ছেড়েছেন। আর দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া তিন প্রতিমন্ত্রী প্রায়ই নিজ নিজ দফতরে অনুপস্থিত থাকছেন। অন্যরা সচিবালয়ে আসছেন মাঝে মধ্যে, অংশ নিচ্ছেন দফতরের নির্ধারিত রুটিন কাজে। এ কারণে সচিবালয়ে মন্ত্রীদের দফতর এখন বলতে গেলে ফাঁকা। মন্ত্রীদের অতিথি কক্ষগুলোও প্রায় নিয়মিতই বন্ধ থাকছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা তালাবদ্ধ করেও রাখা হয়েছে। দফতরগুলোতে নেই আগের মতো দর্শনার্থীদের ভিড়।
সচিবালয়ে সচিবরা আসছেন, নির্ধারিত কাজ করে চলে যাচ্ছেন। সচিবালয় ঘুরে এই চিত্রই দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনও নির্দিষ্ট কাজ না থাকলে সচিবালয়ে নিজ দফতরে আসছেন না বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। কোনও সৌজন্য সাক্ষাৎ, রুটিন কোনও কাজ থাকলে মাঝে মধ্যে নিজ দফতরে এলেও তারা আবার চলেও যাচ্ছেন খুব দ্রুত। কেউ কেউ তো আসেনও না অনেক দিন।
রাজধানীর মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকা কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ নির্বাচনে আগের এই সময়ে নিজ দফতরে অপেক্ষাকৃত বেশি আসছেন, আবার এলাকায়ও যাচ্ছেন। রুটিন ওয়ার্কের বাইরে কোনও কাজ না থাকায় গল্প-আড্ডা দিয়েও সময় পার করছেন তারা।
অপরদিকে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান সচিবালয়ে নিজ দফতরে আগে থেকেই কম আসতেন। এখন আসছেনই না। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ কিছু কর্মসূচিতে অংশ নিলেও কার্যালয়ে আসেন না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনও দফতরে আসা অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছেন।
দলীয় মনোনয়ন পাওয়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল শুরু থেকেই সচিবালয়ে অনিয়মিত। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজ দফতরে এসেছেন হাতে গোনা কয়েক দিন। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন নিজ নির্বাচনি এলাকা রংপুরে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সিলেট ও ঢাকায় পালা করে অবস্থান করছেন। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার আগে থেকেই নির্বাচনি এলাকা নাটোরে অবস্থান করছেন বেশিরভাগ সময়। বাকিটা সময় থাকেন ঢাকায় নিজ বাসভবনে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ব্যস্ত সময় পার করছেন দলীয় কর্মকাণ্ডে। খুব জরুরি কোনও কাজ না থাকলে সচিবালয়ে আসছেন না তিনি। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী দাফতরিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজ নির্বাচনি এলাকা চট্টগ্রামে বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সচিবালয় আর মানিকগঞ্জের পথেই সময় পার করছেন। এর ফাঁকে ফাঁকে মন্ত্রণালয়ের কিছু অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে অংশ নিচ্ছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন নিজ নির্বাচনি এলাকা পিরোজপুরে। মাঝে মধ্যে ঢাকায় এলেও কর্মসূচি না থাকলে সচিবালয়ে আসছেন না। সময় পার করেন সরকারি বাসভবন মিন্টো রোডে।
সংস্কারকাজ চলছে বলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আগে থেকেই সচিবালয়ে অফিস করতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন না। তিনি সেগুনবাগিচায় অবস্থিত মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অফিস করেন। কিন্তু নির্বাচনের কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ায় নির্বাচনি এলাকা চাঁদপুরে যাতায়াত বেড়েছে। একইসঙ্গে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দলীয় কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ বেড়েছে। ফলে মন্ত্রণালয়ের কাজে কমেই দেখা যাচ্ছে তাকে।
১৮ ডিসেম্বর প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পরে সচিবালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আগমন একেবারেই কমে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচারণা চালাবেন প্রার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, মন্ত্রীদের অনুপস্থিতিতেও অফিস করছেন সচিবরা। তবে তারা অনেকটা অলস সময় পার করছেন। বেশিরভাগ সময় তারা দফতরে এসে অভ্যন্তরীণ মিটিং করছেন। পুরোনো ফাইলের কোনও কাজ বাকি থাকলে সেগুলো করছেন। একইসঙ্গে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে দাফতরিক আলাপ-আলোচনা করছেন, ফাঁকে ফাঁকে দর্শনার্থীদের সঙ্গে আড্ডাও দিচ্ছেন। মন্ত্রী যেহেতু নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত, সেহেতু তদবিরও নাই। ফলে অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাচ্ছেন তারা।
জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রীর দফতরের এক কর্মচারী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছেন, স্যার তো আগে থেকেই কম আসেন। মিটিংগুলো করছেন ভার্চুয়ালি। এখন তো নির্বাচনের জন্য নিজ এলাকায় যাচ্ছেন বলে শুনেছি। কাজেই কাজ না থাকলে মন্ত্রণালয়ে না আসাটাই তো স্বাভাবিক।
এই নির্বাচনে নেই বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। বিরোধী জোট থেকেও প্রার্থী নেই মাঠে। তবু নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন মন্ত্রীরা। এরইমধ্যে শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ। সহজেই ছাড় পাচ্ছেন না তারা। কারণ, মন্ত্রী হিসেবে এলাকায় তারা কী দিয়েছেন তার হিসাব চাচ্ছেন ভোটাররা। কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে নিজ কর্মীদের অনেক অপকর্মের। দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানিয়েছেন, যেহেতু নির্বাচন করছি, সেহেতু এলাকায় তো যেতেই হবে। কারণ, সেখানেই রয়েছেন ভোটাররা। ভোটারদের কাছে তো যেতেই হবে। রুটিন ওয়ার্কের বাইরে যেহেতু কাজ নেই, সেহেতু মন্ত্রণালয়ে কম সময় দেওয়া হচ্ছে। তবে সবসময় খোঁজ-খবর রাখছি। কোনও জরুরি কাজ থাকলে তো যাচ্ছি। কাজ কম থাকলেও দায়িত্ব তো কম নয়। মন্ত্রণালয়ের কাজগুলো সমন্বয় করতে হয়। সরকারি কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতির কাজ মনিটরিং করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, অপেক্ষাকৃত ব্যস্ততা কমেছে ঠিকই। কারণ, বড় বড় মিটিংগুলো এখন হচ্ছে না। তবে মন্ত্রণালয়ের পলিসিগত বিষয়গুলো ঠিকই ফলোআপ করতে হচ্ছে। এগুলো দফতরের রুটিন ওয়ার্ক। সেগুলোর কাজ তো চলছে। এ কাজগুলো নিয়ে শৈথিল্যের সুযোগ নাই। এছাড়া সরকারের নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। এসব দিক বিবেচনায় আমাদের রিলাক্সে থাকার সুযোগ নেই।