নতুন পে-স্কেলে কার কত বাড়লো, কে পেলো বেশি

জামাল উদ্দিন
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০১আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০১

দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬’ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। তবে মূল বেতন একসঙ্গে দ্বিগুণ বা তারও বেশি হলেও কর্মচারীরা সেই সুবিধা এখনই একসঙ্গে হাতে পাবেন না। মূল বেতন বাস্তবায়ন হবে তিন ধাপে। আর নতুন হারে ভাতা পেতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত।

সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। নতুন স্কেল গত ১ জুলাই (২০২৬) থেকে কার্যকর হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে সুপারিশ তৈরিতে সচিব কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।

সরকারের হিসাবে নতুন ব্যবস্থায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। পুরো স্কেল কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো বা এমটিবিএফের আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোতে এ অর্থের সংস্থান রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।

বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। সংযুক্ত অনুমোদিত বেতন কাঠামোতে দেখা যায়, প্রথম থেকে একাদশ গ্রেড পর্যন্ত শুরুর মূল বেতন মূলত দ্বিগুণ করা হয়েছে। তবে নিচের গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ১৩তম গ্রেডে শুরুর বেতন ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার, ১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০, ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৪০০ এবং ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। সর্বশেষ ২০তম গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকার শুরুর বেতন বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা— যা প্রায় ১৪২ শতাংশ।

অপরদিকে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। এটাও এক লাফে দ্বিগুণ হয়েছে। দ্বিতীয় গ্রেডের নতুন স্কেল ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার এবং তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে।

২০১৫ সালের স্কেলে সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকার বিপরীতে সর্বোচ্চ ছিল ৭৮ হাজার টাকা। নতুন স্কেলে ২০ হাজারের বিপরীতে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তুলনামূলকভাবে নিচের গ্রেডকে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলা হলেও বাস্তবতা অনেকটা আগের মতোই। সর্বনিম্ন ২০ হাজার আর সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার।

এছাড়া নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঘোষিত নতুন মূল বেতন একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮— দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিনের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সরকার দশম থেকে ২০তম গ্রেডের অপেক্ষাকৃত স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর হবে। কিন্তু বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ নতুন স্কেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাতাগুলো নতুন হারে একযোগে কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। যেখানে বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান বর্ণিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর, দফতর ও সংস্থাকে অনুমোদিত পে-স্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সাবেক সভাপতি বেলাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে, এটি ইতিবাচক। তবে পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেকেই সহজভাবে নেবেন না।”

তিনি বলেন, “মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হবে যে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। কিন্তু একসঙ্গে পে-স্কেল বাস্তবায়ন, আর তিন ধাপে বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। বাস্তবে একজন কর্মচারীর বেতন কতটা বাড়ছে, সেটি পরিষ্কারভাবে দেখতে হবে।”

নিজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আমি ১৩তম গ্রেডে আছি। আমার বর্তমান বেসিক ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। নতুন স্কেলে যদি ওই গ্রেডের বেসিক ২৪ হাজার টাকা ধরা হয়, তাহলে আমার প্রকৃত বেতন কতটা বাড়বে— সেটিই এখন প্রশ্ন। বর্তমান চাকরির মেয়াদ ও সার্ভিস বেনিফিট কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “সার্ভিস বেনিফিট, ইনক্রিমেন্ট এবং বিভিন্ন ভাতা কীভাবে সমন্বয় বা বাড়ানো হবে— এসব বিস্তারিত জানার পরই নতুন পে-স্কেলের প্রকৃত সুবিধা সম্পর্কে মন্তব্য করা সম্ভব। এখনও চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি।”

সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে বর্তমান পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাসে ৯ হাজার টাকা বা কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজারে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজারে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা বেশি নিট পেনশনে ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ‘এক পদ এক পেনশন’ (ওয়ান র‌্যাংক ওয়ান পেনশন) ব্যবস্থা অবশ্য এখনই চালু হচ্ছে না। বিপুল আর্থিক দায় এবং অসামরিক কর্মচারীদের ২০১৯ সালের আগের অবসরসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ঘাটতির কারণে সরকার এটি পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন আরেকটি সংযোজন হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা দিবে সরকার। পাশাপাশি এতদিন মূলত পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে সীমিত মোবাইল ভাতার আওতায় এখন সব গ্রেডকে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক বেতন কমিটি কাজ করছে। সেই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলাদা স্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও গত ১ জুলাই থেকে জাতীয় পে-স্কেলের মতো ধাপে ধাপে কার্যকর করার কথা রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব যা বলেছেন

নতুন জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও সিদ্ধান্তের কথা জানাননি তিনি। সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘‘১ থেকে ১১ গ্রেড পর্যন্ত ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ১২ তম গ্রেডে ১১৫ শতাংশ, ১৩তম গ্রেডে ১১৮ শতাংশ, ১৪তম গ্রেডে ১৩০ শতাংশ, ১৫ ও ১৬তম গ্রেডে ১৩৫ শতাংশ, ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ, ১৯তম গ্রেডে হয়েছে ১৪১ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় বা ‘রিয়েল ওয়েজ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূল্যস্ফীতির পুরো ক্ষতি হয়তো নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি, তবে সেই ক্ষতি যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে যাদের আয় কম, মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে। এ কারণেই নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি রাখা হয়েছে। পে-স্কেল নিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোতে আলোচনার ভিত্তিতেই এ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।’’

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘‘এসব বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে নতুন পে-স্কেল মূলত যারা নির্ধারিত পে-স্কেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য।’’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, সাধারণ মানুষের কপালে কী আছে?
সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও নতুন বেতন নির্দেশাবলি অনুমোদন
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য হবে আলাদা বেতনস্কেল
সর্বশেষ খবর
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ
দেখে শুনে মনে হচ্ছে দেশে কোনও সরকার নেই: রুমিন ফারহানা 
দেখে শুনে মনে হচ্ছে দেশে কোনও সরকার নেই: রুমিন ফারহানা 
মেসিকে নিয়ে আবেগঘন বার্তায় যা বললেন ডি পল
মেসিকে নিয়ে আবেগঘন বার্তায় যা বললেন ডি পল
‘ভাবমূর্তি’ ফেরাতে এবার স্বাস্থ্যসেবায় ঝুঁকছে এআই
‘ভাবমূর্তি’ ফেরাতে এবার স্বাস্থ্যসেবায় ঝুঁকছে এআই
সর্বাধিক পঠিত
সালমান শাহর নায়িকারা কে কোথায়
সালমান শাহর নায়িকারা কে কোথায়
চারপাশে প্রলয়, ভাইরাল সবুজ বাড়িটি টিকে রইলো কীভাবে: ব্যাখ্যা দিলেন প্রকৌশলীরা
চারপাশে প্রলয়, ভাইরাল সবুজ বাড়িটি টিকে রইলো কীভাবে: ব্যাখ্যা দিলেন প্রকৌশলীরা
সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা পাবেন মোবাইল ভাতা
সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা পাবেন মোবাইল ভাতা
ববি হাজ্জাজের নির্দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান
ববি হাজ্জাজের নির্দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান
সাবেক এমপির ছেলেকে নিয়ে কারাগারে থাকা আ.লীগ কর্মীদের ভিডিও বার্তা
সাবেক এমপির ছেলেকে নিয়ে কারাগারে থাকা আ.লীগ কর্মীদের ভিডিও বার্তা