‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনীতে কী থাকছে, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 

ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে যেকোনও ক্ষতিকর বা মানহানিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধান এনে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি-ভিডিও ঠেকাতে আইনে নতুন শাস্তির বিধান যুক্ত করাসহ সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা পুনরায় নির্ধারণ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) দ্বিতীয় দিনে কার্যপ্রণালীর ৭১ বিধিতে দেওয়া জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ‘পুনঃসংজ্ঞা’ ও আইনি সংস্কার 

সংসদে হেলেন জেরিন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক, এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইন হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি তুলে ধরেন।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের প্রধান, তার স্ত্রী ও কন্যাসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিবারকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। স্বাধীনতার নামে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা আসলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিনা, সেটা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।”

তিনি আরও জানান, “সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোকে আইনের আওতায় আনা হবে। আজ সকালেই এই বিষয়ে আমি একটা আইনি সংস্কার করার জন্য ড্রাফটে হাত দিয়েছি।”

‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ ও নতুন শাস্তি 

সংশোধনীর মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “আইনটিকে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ নামে আমরা অবহিত করবো। এর কতিপয় বিধান সংশোধন করবো। এখানে গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে এবং এই ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধানও আইনে যুক্ত করা হবে।”

মেটাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করা হবে 

হেলেন জেরিন খানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, “বাংলাদেশের আইনে এখনও এমন বিধান নেই, যার মাধ্যমে মেটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করা যায়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে মেটাকে ২৪ ঘণ্টায় অ্যাকশন নিতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনে সেই বিধানটা নাই।”

আইনি দুর্বলতার কারণে টেক জায়ান্টগুলো অনেক সময় বিটিআরসি’র অনুরোধে সাড়া দেয় না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “নতুন সংশোধনে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, সময়সীমাভিত্তিক কনটেন্ট অপসারণ এবং রিপোর্ট করা কনটেন্ট অপসারণ প্রক্রিয়া কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার বিধান থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা সংস্থা ও বিটিআরসিসহ ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকেও এই ধরনের কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেওয়া হবে।”

আসছে নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন, সংশোধন হবে মাদক আইনও

ডিজিটাল অপরাধের পাশাপাশি অফলাইন অপরাধ দমনেও দুটি বড় পরিবর্তনের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “জুয়া প্রতিরোধে এখনও ১৮৬৭ সালের আইন দিয়ে চলতে হচ্ছে। নতুন বাস্তবতায় অনলাইন জুয়া, অফলাইন জুয়া এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ ঠেকাতে নতুন আইন আনা হচ্ছে। জুয়া প্রতিরোধ আইন ফাইনাল স্টেজে আছে। আশা করছি সংসদের এই সেশনে আইনটা আনতে পারবো।” 

মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়েও সংশোধনী আনার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, ল্যাবরেটরি সুবিধা ও ডগ স্কোয়াড নেই। অথচ মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক সময় আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্গানাইজেশন করার জন্য আইনি প্রস্তাবগুলো আনবো।”