ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনটি ছিল বেশ উত্তপ্ত, নাটকীয় এবং নানামুখী বিতর্কে ভরপুর। একদিকে যেমন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন, তেমনি খোদ সরকারি দলের পক্ষ থেকেও ই-টেন্ডারিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। অপরদিকে সাইবার অপরাধ দমনে মেটা-ফেসবুকের ওপর কড়াকড়ি আনতে নতুন আইনি সংস্কারের ঘোষণাও এসেছে আজকের অধিবেশনে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খালি আসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো থেকে শুরু করে ত্রাণ ম্যাপের রাজনীতিকীকরণ।
সোমবার (৮ জুন) সংসদের আলোচনায় উঠে আসা এমন সব চমকপ্রদ ও নীতি-নির্ধারণী খবরাখবরের বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো—
বজ্রপাত ও দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে তাল গাছ রোপণের মতো প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিদ্যমান জাতীয় নীতিমালা আধুনিকায়ন এবং বজ্রাঘাতে প্রাণহানি কমাতে মাঠপর্যায়ে নানামুখী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সরকার। এছাড়া মাঠপর্যায়ে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার ও বিশেষ মহড়ার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় কৃষক ছাউনি কাম বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং ব্যাপক হারে তাল গাছ রোপণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে (বাজেট অধিবেশন) সংসদ সদস্যদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এই কথা বলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী।
সংরক্ষিত নারী আসন-১০ এর সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি’র প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, সামগ্রিক ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, টর্নেডো, বন্যা, খরা ও নদী ভাঙ্গনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার ইতোমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং (২০২১-২০২৫) এবং ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডারস অন ডিজাস্টার’ বা এসওডি প্রণয়ন করেছে। বর্তমান সরকার এই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিদ্যমান পরিকল্পনাগুলোকে আরও সময়োপযোগী ও হালনাগাদ করতে কাজ করছে। এরই অংশ হিসেবে এসওডি সংশোধন এবং ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের নতুন জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত জনবল গঠন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণা কার্যক্রম গতিশীল করতে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজের শুভ উদ্বোধন করেছেন, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করবে।
এদিকে বজ্রাঘাতে প্রাণহানির বিষয়ে সংরক্ষিত নারী আসন-২-এর সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানার করা প্রশ্নের জবাবে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, “দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় প্রাণহানি কমানোর বিষয়ে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া অধিদফতর এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বজ্রপাতের পূর্বাভাস তৈরি করে তা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি ‘ইন্টিগ্রেটেড ভয়েস রেসপন্স’ বা আইভিআর প্রযুক্তির সাহায্যে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।” এছাড়া মাঠপর্যায়ে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার ও বিশেষ মহড়ার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় কৃষক ছাউনি কাম বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং ব্যাপক হারে তাল গাছ রোপণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খালি আসন দেখিয়ে রুমিন বললেন ‘কী আর করা, অনুপস্থিতিতেই বলি’
‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ এখানে উপস্থিত থাকবেন কিন্তু সামনে তাকিয়ে দেখলাম তার আসনটি খালি, অর্থাৎ তিনি উপস্থিত নাই। কী আর করা, তার অনুপস্থিতিতেই বলি।’ —এভাবেই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সরকারের প্রথম ১০০ দিনে হত্যা, অপহরণ ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে তিনি সংসদে এই ঝাঁঝালো বক্তব্য দেন তিনি।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ৭১ বিধিতে দাঁড়িয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
সরকারি-বিরোধী দল দেখে কি দুর্যোগ আসে, প্রশ্ন আখতারের
সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য বিবেচনা করে দেশে দুর্যোগের কোনও আলাদা মানচিত্র তৈরি হয়েছে কিনা, জাতীয় সংসদে এমন প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের সদংসদ সদস্যদের টিআর-কাবিখার বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের তা দেওয়া হয়নি।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, যেসব সংসদ সদস্য বরাদ্দের জন্য চাহিদাপত্র দিয়েছেন, তারা আগামী কাল-পরশুর মধ্যেই তা পেয়ে যাবেন।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) দ্বিতীয় দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই আশ্বাস দেন। বিকাল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এই অধিবেশন শুরু হয়।
অধিবেশনে সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, “আমাদের বাংলাদেশের দুর্যোগের যে ম্যাপ সেটাতে কি কোনও ধরনের পরিবর্তন এসেছে? কারণ আমরা দেখলাম যে, দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে গত ৩০ শে এপ্রিলে যে বরাদ্দটা দেওয়া হয়েছে, সেটা শুধুমাত্র সরকারি দলের আসনগুলোতে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলের কারও আসনে বরাদ্দ দেওয়া হয় নাই। যদি এরকমটা হয়ে থাকে, যে বাংলাদেশে দুর্যোগগুলো যখন আসবে তখন শুধু সরকারি দলের আসনগুলোতেই আসবে, বিরোধী দলের আসনগুলোতে আসবে না, তাহলে হয়তো একভাবে হতে পারতো। কিন্তু দুর্যোগ যখন আসে তখন কিন্তু আমরা সবাই সাফারার হই।”
ত্রাণ বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, “গত ৩০শে এপ্রিলে ৮৫ লাখ টাকা এবং ৯০ টন করে চাল ও গম শুধুমাত্র সরকারি দলের এমপি বা সরকার দলের আসনগুলোতে বরাদ্দ করা হয়েছে। বিরোধী দলের কোনও আসনেই এটি দেওয়া হয়নি। এই অর্থ জনগণের ট্যাক্সের টাকা। জনগণের অর্থ আহরণ করে তারপরে এই বরাদ্দ করা হয়। বিরোধী দলের আসনের সাধারণ নাগরিকদের প্রতি এটি চূড়ান্ত বৈষম্য।”
এসময় তিনি ত্রাণমন্ত্রীর কাছে বৈষম্য দূর করে কবে নাগাদ বিরোধী দলের এমপিদের সমতাভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হবে তা জানতে চান।
সরকার পক্ষের ঠিকাদার কাজ পায় না, পিপিআর রিভিউয়ের আশ্বাস মন্ত্রীর
ইজিপিতে (ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের দরপত্র আহ্বান করেও সরকার পক্ষের ঠিকাদাররা কাজ পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) সংশোধন করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশের (প্রথম বাজেট অধিবেশন) দ্বিতীয় দিন ৭১ বিধিতে নংসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের উত্থাপন করা নোটিশের জবাবে পিপিআর সংশোধন করার কথা জানান মন্ত্রী।
৭১ বিধিতে নোটিশ উত্থাপন করে সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, “আমার প্রশ্নটা হলো আমরা যদি আমার জেলার ভেতরে কন্ট্রাক্টরের কাছে নিয়ে আসি, আমি তাকে ধরতে পারবো। পাশাপাশি ফ্যাসিস্টরা যাতে না আসতে পারে সেইজন্য উনি (মন্ত্রী) কী ব্যবস্থা করবেন?”
এসময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এই বিষয়গুলো আমরা অবগত আছি এবং আমরা ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেছি, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেছি। আমরা এই আইনটার কীভাবে রিভিউ করে এটা সঠিক লোকেরা যেন পায় সেটা আমরা বিবেচনা করবো।”
‘ফেসবুক থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করতে আইন সংশোধন হচ্ছে’
ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধানও সাইবার সুরক্ষা আইনে আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) দ্বিতীয় দিন কার্যপ্রণালীর ৭১ বিধিতে দেওয়া জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের বক্তব্যের জবাবে এই কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”









