জাতীয় সংসদে এমপিরা নানা প্রতিশ্রুতি দেন। এই প্রতিশ্রুতির কখনও শতভাগ, কখনও আংশিক কিংবা কখনও পূরণই হয় না। এই প্রতিশ্রুতি পালনের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সাধারণ মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিশ্রুতির বিষয় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সম্প্রতি সংসদে একজন মন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতির বিষয়ে স্পিকারের সতর্ক করার বিষয়টি এর গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গুরুত্ব অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন জরুরি।
প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে সতর্ক করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। ভালোভাবে পর্যালোচনার পর সংসদে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মন্ত্রীকে।
রবিবার ৭ জুন) সংসদের বৈঠকে স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা এক প্রশ্নে বলেন, ‘লোডশেডিং বলুন আর মেরামত শেডিং বলুন, গ্রামে গঞ্জে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুত থাকে না।’ বিরোধীদলের এমপিরা এই বক্তব্য টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বিদ্যুৎমন্ত্রী এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, ১ মে’র মধ্যে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হবে। এরপরে আরও এক মাস, তিন-চার দিন পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারে গ্যাসের সাপ্লাই আমরা পাইনি।’
রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দেশে গ্যাসের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। বর্তমানে সার কারখানার চেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি বিদ্যুৎ চাচ্ছেন, আবার তার সার কারখানাতেও গ্যাস চাচ্ছেন। গ্যাসের তো একটা সীমাবদ্ধতা আছে। এ জন্য আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালিয়ে রাখতে হচ্ছে এবং সেই কারণে তার ওখানে আমরা সংযোগ দিতে পারছি না।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছরে গ্যাসের খনন করা হয়নি। আমরা এই প্রথম এসে ড্রিলিং শুরু করেছি এবং আশা করি ইনশাআল্লাহ, আমরা গ্যাস পাবো। গ্যাস পাওয়ার পরে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারের মতো কারখানায় আমরা সংযোগ দিতে পারবো।’
মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্ত্রীকে তার দেওয়া আগের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কিন্তু সংসদে বলেছিলেন ১ তারিখ থেকে গ্যাস যাবে। সেটি বোধ হয় পাওয়া যায়নি।’
ভবিষ্যতে সংসদে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেন, ‘সংসদে যে প্রতিশ্রুতি দেবেন, সেটা ড্রিলিং বা অন্যান্য যাবতীয় আনুষঙ্গিক বিষয় স্টাডি করে তারপরে সংসদে দেবেন।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজেকুজ্জামান রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংসদের প্রতিশ্রুতি দেওয়াটা আসলে কোনও আইনি ভিত্তি আছে কিনা, তার কোনও নৈতিক দায় আছে কিনা, সেটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এটা যে রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি, সেটা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নাই। ফলে সংসদে প্রতিশ্রুতিগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি। সংসদ আইন প্রণয়নের জায়গা, সেখানে তো গম বিতরণ, রাস্তা নির্মাণ, হাসপাতাল তৈরি, কিংবা এই যে ব্রিজ-কালভার্টের কথা যারা বলেন, তারা আসলে সংসদকে উদ্দেশ্য করে বলেন না, তারা বলেন— তাদের ভোটারদের উদ্দেশ্য করে।’’
রতন আরও বলেন, ‘‘এতে করেই সংসদ সদস্যদের দায় এবং তাদের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভের একটা অন্যতম সংসদ। এই সংসদের জন্যই তো আমাদের এত আন্দোলন। আমরা সংসদকে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হতে দেখতে চাই। আমরা সংসদে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা শুনতে চাই। আমরা সংসদকে একটা আইন প্রণয়নের জায়গা হিসেবে দেখতে চাই এবং সংসদকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই। সেগুলো না হয়ে সংসদে যদি শুধুমাত্র এই দাবি দাওয়াভিত্তিক আলোচনা হয়, পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের একটা চাতুর্যের লড়াই যদি দেখি, এটা একটা এক ধরনের বাকযুদ্ধ হিসেবে যদি দেখি, তাহলে মানুষের প্রত্যাশা তো পূরণ হয়ই না, সংসদের মানটাও নেমে যায়।’’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘অনেকেই আছেন প্রতিশ্রুতি দেয় সেটা ভঙ্গ করার জন্য। প্রতিশ্রুতি দেন ভোট পাওয়ার জন্য, ভোট পাওয়ার পর ভুলে যান। কতগুলো আছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, কতগুলো আছে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। কম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো মানা সহজ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো— যেগুলোতে যে পরিবর্তন দরকার, সংস্কার দরকার, কাঠামার মধ্যে পরিবর্তনের দরকার, সেগুলো তো করতে অনাগ্রহী। যেমন একটা উদাহরণ হলো— আওয়ামী লীগের আমলে প্রতিশ্রুতি করেছিল যে, তারা দিন বদল করবে, ২০০৮ সালে নির্বাচনে তারা দিয়েছিল ‘দিন বদলের সনদ’ এটা তো তারা বাস্তবায়ন করে নাই বরং বাস্তবায়ন না করে তারা বলেছে, বাস্তবায়ন করে ফেলেছে।’’









