দেশের চামড়া খাতের বৈশ্বিক সক্ষমতা ও রফতানি বাড়াতে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো ইন্টার-বন্ড ট্রান্সফার বা এক বন্ড থেকে অন্য বন্ডে পণ্য স্থানান্তরের সুবিধা দিতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে এই খাতের জন্য একটি সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস বা কেন্দ্রীয় বন্ডেড গুদাম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পের উৎপাদনশীলতা, সক্ষমতা এবং রফতানি পারফরম্যান্স বাড়াতে সরকার ২৩টি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসানের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই তথ্য জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে এবং পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময় (লিড টাইম) কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কমপ্লায়েন্ট বা শর্তানুসারী জুতা ও চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোকে ‘গ্রিন চ্যানেল’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ট্যানারি মালিক এবং ট্যানারিবিহীন রফতানিকারকরা ফ্ল্যাট রেট বা শুল্কমুক্ত সুবিধায় প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানি করতে পারবেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ও সংকটে থাকা চামড়া কারখানাগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের জন্য সরকার নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “এই খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও পণ্য উন্নয়নের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক, জুতার উপাদান এবং বিভিন্ন অনুষঙ্গ বা অ্যাকসেসরিজ দেশেই উৎপাদনের প্রচেষ্টা চলছে। এসব ক্ষেত্রে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং যৌথ উদ্যোগের প্রকল্পগুলোকে উৎসাহিত করা হবে।” চামড়া খাতের সার্বিক উন্নয়নে ‘লেদার সেক্টর বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল’ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও তিনি জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “রফতানিমুখী চামড়া শিল্পের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা এবং ডিউটি ড্র-ব্যাক বা শুল্ক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও আধুনিক করার কাজ চলছে। এছাড়া খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে পণ্যের গুণগত মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ বাড়াতে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পুরো চামড়া খাতে ব্যালেন্সিং, আধুনিকীকরণ, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ (বিএমআরই) কার্যক্রম সহায়তায় একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।”
মন্ত্রী জানান, ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাসহ সাধারণ ব্যবসায়ীরা যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের নতুন বাজার তৈরি করতে পারেন, সেজন্য সরকার তাদের বিশেষ সহায়তা দেবে।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে ‘লেদার সেক্টর এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন, একটি প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন এবং সব আকারের কারখানার রফতানি-সংশ্লিষ্ট সংস্কার কাজে সহায়তার জন্য ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড’ থেকে আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
এছাড়া পণ্যের মান নিশ্চিত করতে উন্নত ল্যাবরেটরি ও সার্ভিস সেন্টার স্থাপন, উদ্যোক্তাদের জন্য দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব রাসায়নিকের ব্যবহার উৎসাহিত করা, মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ট্যানারি মালিক ও এজেন্টদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধা-প্রসেস বা ক্রাস্ট চামড়া রফতানির পরিবর্তে ফিনিশড বা চূড়ান্তভাবে প্রস্তুতকৃত চামড়া উৎপাদনে জোর দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের মানোন্নয়ন, একটি ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, লেদার টেকনোলজি কলেজের আধুনিকীকরণ এবং শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিকের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার আশা করছে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে চামড়া খাতে দেশের কাঙ্ক্ষিত রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।