বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ থেকে পাঁচ বছরে নিট মুনাফা ১৬৩ কোটি 

দেশের প্রথম উপগ্রহ ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’-এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে গত পাঁচ অর্থবছরে সর্বমোট ১৬৩ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছে। এই সময়ে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৭৬৪ দশমিক ১০ কোটি টাকা বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। 

বুধবার (২৪ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম অধিবেশনের ১৪তম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এসব তথ্য জানান। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জনাব মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সংসদে এসব তথ্য দেন। 

মো. আবুল হাসনাত তার প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলেন, “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে কাঙ্ক্ষিত আয় করতে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যেই শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২’ উৎক্ষেপণের নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রথম স্যাটেলাইট থেকে গত ৫ বছরে মোট কত টাকা নিট লাভ হয়েছে এবং স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) কী? এটিও যে আরেকটি ‘শ্বেত হস্তী’ (হোয়াইট এলিফ্যান্ট) প্রকল্পে পরিণত হবে না— তার গ্যারান্টি কী?” 

মো. আবুল হাসনাত তার লিখিত প্রশ্নে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উল্লেখ করলেও মন্ত্রী তার লিখিত উত্তরে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট উল্লেখ করেন।  

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে যত স্থাপনা ছিল, সেগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়। ওই সময় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ স্যাটেলাইট। এরপর থেকে সরকারি নথিপত্রে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। 

আজ জাতীয় সংসদে বৈঠকে লিখিত উত্তরদানের জন্য প্রশ্ন উত্তর বইয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর এই প্রশ্নটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রশ্নটি মূলত ১৪ জুন তারিখের জন্য নির্ধারিত ছিল। 

মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ এর বাণিজ্যিক ব্যবহার চলছে। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার, ডিটিএইচ সেবা, ভি-স্যাট সেবা, বিদেশে স্যাটেলাইট ব্যান্ডউইথ বিক্রয় এবং দুর্যোগকালীন জরুরি টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানের মাধ্যমে এটি দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় অবদান রাখছে। 

সংসদে উপস্থাপিত বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) বিগত ৫ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ ২০২০-২১ অর্থবছরে ১২৯ দশমিক ১১ কোটি টাকা রাজস্ব আয় এবং ৮৪ দশমিক ২৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৩০ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয় এবং ৮৫ দশমিক ২৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪৭ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা রাজস্ব আয় এবং ৭৩ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৬৯ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয় এবং ২৯ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ১৮৭ দশমিক ০৭ কোটি টাকা, নিট মুনাফা হয়েছে ৩৮ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা।  

গত ৫ অর্থবছরে সর্বমোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৭৬৪ দশমিক ১০ কোটি টাকা এবং সব মিলিয়ে নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৩ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। 

মন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের ৩০ জুন স্যাটেলাইটের সম্পত্তি বিএসসিএলের নিকট হস্তান্তরিত হওয়ায় এবং ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে অবচয়মূল্য (ডেপ্রিসিয়েশন) হিসাবভুক্ত করার কারণে ওই নির্দিষ্ট অর্থবছরে কাগজে-কলমে লোকসান দেখা গেলেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা পুনরায় মুনাফায় ফিরে এসেছে।  

‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-২’ উৎক্ষেপণ প্রকল্প প্রসঙ্গে মন্ত্রী সংসদকে জানান, এটিকে মূলত একটি ‘আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট’ হিসেবে মহাকাশে পাঠানোর কাজ চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের কৃষি, মৎস্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রপথে চলাচলরত জাহাজের ট্র্যাকিং, ব্লু ইকোনমি এবং দেশের সামগ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।  

প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও ফলপ্রসূতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি সম্ভাব্যতা যাচাই বা সিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যেই তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাবনা পাওয়া গেছে, যা বর্তমানে যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণাধীন রয়েছে। এই ফিজিবিলিটি স্টাডির ফলাফল প্রাপ্তি সাপেক্ষেই পরবর্তী চূড়ান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলে মন্ত্রী তার জবাবে তাকে আশ্বস্ত করেন।