কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ নতুন একটি আইন প্রণয়ন করছে বর্তমান সরকার। প্রস্তাবিত এই আইনে প্রথাগত আপত্তির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনের যেকোনও ধরনের ‘ডিজিটাল আচরণ’কেও যৌন হয়রানি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হচ্ছে।
সম্প্রতি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়ন করেছে। এই আইনে শারীরিক, মৌখিক, মানসিক ও ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের দেওয়া ঐতিহাসিক নির্দেশনার আলোকেই মূলত এই আইনের খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়।
অধ্যাদেশ থেকে আইন: পটভূমি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের সংবিধানে সব নাগরিকের জন্য ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, তা সমুন্নত রাখতেই হাইকোর্ট বিভাগ যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছিল।
বিগত ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়াটি উপদেষ্টা পরিষদে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। তবে সেটি এসআরও (সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ) বা গেজেট আকারে জারি হওয়ার আগেই গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করতে খসড়াটি সারসংক্ষেপসহ মন্ত্রিপষিদ বিভাগে পাঠানো হয়। গত ১৬ জুন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন পারভীন খসড়া আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠান। এরপর গত ১৮ জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটি আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পুনরায় মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণলয়ের সচিব ইয়াসমিন পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত আছে—আমাদের আরও কিছু কাজ করতে হবে। লেজিসলেটিভ বিভাগের সঙ্গে বসে আমাদের কিছু আইনি যে ভাষা সেটাকে আরও ঠিক করতে হবে। আইনের অপব্যবহার রোধ এবং নারী নির্যাতনের সঙ্গে সঙ্গে একজন নির্দোষ পুরুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়টাও নিশ্চিত করা হবে।”
বিষয়টি সামনের মন্ত্রিসভায় উঠবে কিনা জানতে চাইলে সচিব ইয়াসমিন পারভীন বলেন, “এই সেশনে করতে পারলে আমারও খুব ভালো লাগতো। তবে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, এটা অনুমোদিত হবে।”
প্রস্তাবিত খসড়া আইনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
৪টি অধ্যায় এবং ১৯টি ধারায় বিন্যস্ত প্রস্তাবিত ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় বেশ কিছু যুগান্তকারী বৈশিষ্ট্য রাখা হয়েছে:
১. ডিজিটাল আচরণের অন্তর্ভুক্তি: শারীরিক, মৌখিক, মানসিক ও ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের (ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল ইত্যাদি) যেকোনও আপত্তিকর আচরণ যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য হবে। এই আইনের বিধান অন্য যেকোনও বিধির ওপর প্রাধান্য পাবে।
২. নারী নেতৃত্বাধীন কমিটি ও সময়সীমা: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী নেতৃত্বে গঠিত কমিটি মৌখিক, লিখিত বা অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করবে এবং সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।
৩. সুরক্ষা ও গোপনীয়তা: অভিযোগকারীকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হবে। শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তদন্তের স্বার্থে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
৪. মিথ্যা অভিযোগে শাস্তি: আইনের অপব্যবহার রুখতে যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছেন, তবে সেই অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও আইনি শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৫. তদারকি কমিটি গঠন: বাধ্যতামূলকভাবে স্থানীয় পর্যায়ে ‘অভিযোগ কমিটি’ এবং জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘মনিটরিং কমিটি’ গঠন করা হবে। আইন পাসের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে এর বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বর্তমান বাস্তবতার বৈপরীত্য
২০০৮ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যা আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন আইন হিসেবে কার্যকর থাকার কথা বলা হয়েছিল। এই নির্দেশনার প্রধান দিকগুলো ছিল—
সংজ্ঞা নির্ধারণ: অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, অশালীন অঙ্গভঙ্গি, যৌন সুবিধা দাবি, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন, প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে হুমকি, ফোন বা এসএমএসে হয়রানি এবং পিছু নেওয়াকে (স্টকিং) যৌন হয়রানি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা।
অভিযোগ কমিটি: প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ৫ সদস্যের কমিটি থাকবে, যার প্রধান হবেন একজন নারী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য হবেন নারী। একজন বহিরাগত মানবাধিকার কর্মীও কমিটিতে থাকবেন।
তদন্তের সময়: অভিযোগ পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে, বিশেষ প্রয়োজনে তা ৬০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্ত বা ক্লাসে আসা স্থগিত রাখা যাবে।
যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০০৮ সাল থেকেই বিভিন্ন অফিস আদেশ জারির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছিল এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) বারবার তাগিদ দিয়েছে, কিন্তু কোনও স্থায়ী আইন এবং শাস্তির কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বহু বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে আদালতের এই নির্দেশনা এতদিন ঠিকমতো প্রতিপালন করা হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র কমিটি থাকলেও সামনে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘অভিযোগ বক্স’ বা কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি।
সংলাপ নয়, ওয়েবসাইটের মতামতেই চূড়ান্ত হবে আইন
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় বিভিন্ন বিভাগ ও অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) মতামত অন্তর্ভুক্ত করে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এটি জুনের মধ্যেই লেজিসলেটিভ ভেটিং শেষে চূড়ান্ত রূপ পাবে।
এই বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে নতুন করে কোনও গোলটেবিল বা সংলাপ হবে কিনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট আইনি পর্যালোচনাকারীরা জানান, নতুন করে কোনও সংলাপের প্রয়োজন দেখছেন না তারা। খসড়াটি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সেখানে রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকসহ সবাই নিজস্ব মতামত বা সংশোধনী প্রস্তাব আকারে জমা দিতে পারবেন এবং সেসব মতামতের যৌক্তিকতা বিবেচনা করেই আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরবর্তী মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।