সংসদে রুমিন ফারহানা

‘প্রবাসীদের শ্রম-ঘামেই টিকে আছে অর্থনীতি, এর পেছনে আছে লাশ ও ত্যাগের গল্প’

বিদেশে কর্মরত এক কোটির বেশি বাংলাদেশির শ্রমে দেশের অর্থনীতি টিকে থাকলেও এর পেছনে রয়েছে মৃত্যু, বিচ্ছিন্নতা ও ত্যাগের নির্মম বাস্তবতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা জাতীয় সংসদে এমন মন্তব্য করেছেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৪তম দিনে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১-এ প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট নবায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, হয়রানি ও সেবার মানোন্নয়ন-সংক্রান্ত নোটিশের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, প্রায় এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত। আন্তর্জাতিক অভিবাসী শ্রমিকের উৎসদেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধ পথে দেশে এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। এই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি কিংবা গার্মেন্টসহ অন্যান্য রফতানি খাত থেকেও আসেনি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ।

তার ভাষ্য, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ অর্থনীতি, আমদানি ব্যয় এবং লাখো পরিবারের জীবিকা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রেমিট্যান্সের আড়ালে যে বিশাল মানবিক মূল্য রয়েছে, তা আলোচনায় আসে না। অর্থ, রিজার্ভ বা বিদেশে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে হিসাব হয়, কিন্তু তাদের কষ্টের গল্প অদৃশ্যই থেকে যায়।

ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের তথ্য তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, ২০২৪ সালে বিদেশ থেকে ৪ হাজার ৮১৩ জন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে এসেছে, যা স্বাধীনতার পর এক বছরে সর্বোচ্চ। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ফিরেছে ৩৮ হাজার মরদেহ। মৃতদের অধিকাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে। এ বয়সে গুরুতর সহ-রোগ থাকার কথা নয়। বৈরী পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও কঠোর পরিশ্রমের কারণেই প্রতিবছর এত বিপুলসংখ্যক মরদেহ দেশে ফিরছে।

অভিবাসনের মূল্য শুধু অর্থ বা পরিসংখ্যানে মাপা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে পরিবারে দূরত্ব তৈরি হয়। এমন অনেকের গল্প রয়েছে, যারা এক বছরের সন্তান রেখে বিদেশে গেছেন, দেশে ফিরে দেখেছেন সন্তান কিশোর হয়ে গেছে। বাবা সন্তানকে ঠিকমতো চেনেন না, সন্তানও বাবাকে চিনতে পারে না।

রুমিন ফারহানার মতে, অনেক প্রবাসী সম্পদ গড়তে দেশে অর্থ পাঠালেও সেই সম্পদের মালিকানার নথিতে অনেক সময় তাদের নিজের নামই থাকে না। এত কষ্ট ও বঞ্চনার পরও প্রবাসী শ্রমিকদের শ্রম ও ত্যাগই দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।

দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভাষাজ্ঞান ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসীরা আরও ভালো চাকরি পাবেন, রেমিট্যান্স বাড়বে এবং নিরাপদ অভিবাসনও নিশ্চিত হবে।

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, প্রবাসী শ্রমিকদের সেবা উন্নত করতে সরকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। মৃত প্রবাসী শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং মরদেহ যথাযথ মর্যাদায় দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, যোগ্য মৃত প্রবাসী শ্রমিকের পরিবারকে দুই মাসের মধ্যে তিন লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরা শ্রমিকরা চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পান।

পাসপোর্ট, বিমানবন্দর, ভিসা, চিকিৎসাসেবা ও প্রবাসীকল্যাণ-সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যা সমাধানে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো, অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা রোধ এবং বৈধ অভিবাসনে শ্রমিকদের উৎসাহিত করতে সরকার কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।