আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে নিয়োগের অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তদন্ত শেষ হলে এর ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জয়নুল আবদিন ফারুক জানতে চান, আগের ১৭ বছরে রাজনৈতিক ভিত্তিতে পুলিশে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করা হবে কি না। একইসঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় লুট হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা সম্পর্কেও জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের’ সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে নিয়োগের অভিযোগের তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে তদন্ত অনেকটা এগিয়েছে এবং এখন তা শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা তদন্তে একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি। তদন্ত শেষ হলে জাতির সামনে তা প্রকাশ করবো।’
জেলা কোটা নিয়ে অনিয়ম
পুলিশে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জেলায় অনিয়মের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার মানুষ কনস্টেবল, উপপরিদর্শক (এসআই) ও অন্যান্য পদে নিয়োগ পেয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, জেলা কোটার সুবিধা নিয়ে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই সংশ্লিষ্ট জেলার প্রকৃত বাসিন্দা ছিলেন না। কেউ কেউ ওই জেলায় সামান্য জমি কিনে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন।
ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জে এ ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান
বিভিন্ন ঘটনার সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চলছে বলে সংসদকে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের চলমান অভিযানে যে আগ্নেয়াস্ত্রগুলো উদ্ধার হচ্ছে, এর মধ্যে কিছু লুট হওয়া অস্ত্রও রয়েছে। এসব অস্ত্রের সিরিয়াল নম্বর থাকে। সিরিয়াল নম্বর মিলিয়ে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার হলে গণমাধ্যমকে জানানো হচ্ছে।’
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কারাগার বা অন্য কোথাও থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পুলিশে আরও ১ লাখ পদ
রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পুলিশের জনবল বাড়াতে ৪ হাজার নিরস্ত্র উপপরিদর্শক (এসআই), ৪০০ সার্জেন্ট এবং ১ লাখ কনস্টেবলের নতুন পদ সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের জনবল বাড়বে বলে জানান তিনি। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পুলিশের যানবাহন ও জলযানের সংকটও দূর করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পুলিশের প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ একাডেমিগুলোর নিয়মিত প্রশিক্ষণে নৈতিক শিক্ষা, শারীরিক প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গণপিটুনি কমেছে
আরেক প্রশ্নের জবাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ের সঙ্গে ২০২৬ সালের একই সময়ের তুলনামূলক তথ্য তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, এ সময়ে গণপিটুনি বা সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতার ঘটনা ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টিতে নেমেছে।
একই সময়ে সংখ্যালঘুদের সংশ্লিষ্ট ঘটনার সংখ্যাও ৯৯৯ থেকে কমে ১৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
১৪ বছরে ১৯ হাজার ৬৪১ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স
জামালপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৯ হাজার ৬৪১টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে শটগানের লাইসেন্স ৭ হাজার ৩০৮টি, পিস্তলের ৫ হাজার ৩৪৭টি, রিভলভারের ৫৯৪টি, রাইফেলের ৯৪৮টি এবং অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ৫ হাজার ৪৪৪টি।
গণপিটুনির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণপিটুনির বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
মাদকবিরোধী অভিযানে ১৭ হাজার গ্রেফতার
বিএনপির সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ৫৫ হাজার ২৫১টি অভিযান পরিচালনা করেছে।
এসব অভিযানে ১৬ হাজার ৩৭৩টি মামলা করা হয়েছে এবং ১৭ হাজার ১৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।