ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে সংযোজিত বহুল আলোচিত ১৮ক ধারা বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ ধারায় রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়া বা একীভূত হওয়া ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডার বা মালিকদের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পুনরায় ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ১৮ক ধারার পূর্ণ শর্ত পরিপালন করে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ধারাটি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে উত্থাপিত ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পরীক্ষা করে দেওয়া অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
১৮ক ধারায় যা ছিল
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮ক ধারা সংকটে পড়া বা রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়া ব্যাংকের সাবেক মালিকদের জন্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছিল। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে সাবেক মালিক বা শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকটির মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের জন্য আবেদন করতে পারতেন।
ধারাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল—আবেদনকারীকে ব্যাংকের মূলধন ও আর্থিক দায়-দায়িত্ব পুনর্গঠনের বিষয়ে নির্ধারিত অঙ্গীকার করতে হতো। পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাও ছিল। প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পুনরুদ্ধার মূল্যের অন্তত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ, কোনও ব্যাংক রেজল্যুশনের আওতায় যাওয়ার পর সাবেক মালিকরা নির্দিষ্ট আর্থিক ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করে আবার সেই ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ পেতেন।
সংশোধনী বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল ব্যাংককে সচল রেখে পুনর্গঠন করা, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট দূর করা এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করা। একইসঙ্গে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানোর বিষয়টিও এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল।
কেন বাতিলের উদ্যোগ
স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন কার্যকর হওয়ার পর ধারা ১৮ক-এর পূর্ণ শর্ত পরিপালন করে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি।
এ কারণে ধারাটি বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা সমীচীন হয়েছে বলে মনে করেছে কমিটি।
সংশোধনী বিলে সরাসরি বলা হয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮ক ধারা বিলুপ্ত হবে এবং সংশোধনী আইনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
আলোচনায় ছিল ১৮ক
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন পাস হওয়ার পর থেকেই ১৮ক ধারা নিয়ে ব্যাংক খাত ও সুশীল সমাজে বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, কোনও ব্যাংকের পতন বা সংকটের জন্য দায়ী সাবেক মালিকরাও নির্দিষ্ট আর্থিক শর্ত পূরণ করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারেন।
এ নিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসসহ বিভিন্ন মহল থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, সরকারের সংশোধনী উদ্যোগের ফলে এখন সাবেক মালিকদের পুনরায় ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগটি আইনি কাঠামো থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তার শর্তের সঙ্গেও ১৮ক ধারা বাতিলের বিষয়টি সম্পর্কিত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির সুপারিশ
গত ৩ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বৈঠকে বিলটি উত্থাপনের পর কার্যপ্রণালি-বিধির ২৪৬ বিধি অনুযায়ী পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য এটি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ৫ সেপ্টেম্বর কমিটি বিলটি পরীক্ষা করে।
কমিটি বিলটির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে উত্থাপিত আকারেই সংসদে পাস করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করেছে।
বিলটি উত্থাপন করেন ভারপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংশোধনীটি পাস হলে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮ক ধারা বিলুপ্ত হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।