সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার নামে প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকা আদায় বন্ধের দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন। তিনি এই আদায়কে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ আখ্যা দিয়েছেন। একইসঙ্গে শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দিতে ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রস্তাবও তুলে ধরেছেন এই সংসদ সদস্য। সংকট মোকাবিলায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে শক্তিশালী ‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠন, এলএনজি খাতের দুর্নীতির তদন্ত এবং জ্বালানি মজুত বাড়ানোরও দাবি জানান তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে উত্থাপিত নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন।
এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। এর আগে বেলা ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
বিদ্যুৎ-গ্যাস পাওয়া জনগণের অধিকার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে জনগণের অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়ার অধিকার জনতার। এটা কারও দয়া বা দান নয়।’
তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ নিয়মিত বিল ও ট্যাক্স দেয়। কৃষকের ঘাম ঝরানো টাকা, শ্রমিকের কষ্টার্জিত আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে এই খাতে বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়। ফলে এই অর্থের সঠিক হিসাব ও সুশাসন নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সংকট সমাধানে বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ জানানো হলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই বিরোধী দল তথ্য-উপাত্তসহ সংকট সমাধানের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা সংসদে তুলে ধরছে বলে জানান তিনি।
সক্ষমতার চেয়ে কম চাহিদা, তবু লোডশেডিং
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। অথচ দৈনিক সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এরপরও সারাদেশে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি আর্থিক ও ব্যবস্থাপনার সংকটকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে সরকারের বকেয়া পাওনা প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বকেয়া না পাওয়ায় উৎপাদকেরা কয়লা, তেল ও প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ কিনতে পারছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস বসিয়ে রেখেও প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ বন্ধের দাবি
বিদ্যুৎ খাতের ভূতুড়ে বিল, অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার সমালোচনা করে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, এসবের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৮০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা মিটার ভাড়া হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। এর কোনও যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
অবিলম্বে ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া আদায়ের এই প্রথা বন্ধের দাবি জানান তিনি।
গ্যাসের ঘাটতি ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট
গ্যাস সংকটের চিত্র তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, গত ১৭ বছরে অনশোর বা অফশোর কোনও গ্যাসকূপের প্রয়োজনীয় খনন বা পুনঃখনন, অর্থাৎ ওয়ার্কওভার করা হয়নি। এতে দেশীয় গ্যাস উত্তোলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে প্রতিদিন ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
ফলে দেশে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পাইপলাইনের অভাবে প্রায় ৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির পেছনে গত অর্থবছরে ৫৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গত ২১ জুলাই একটি এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের পর তৈরি হওয়া গ্যাস সংকট এখনো বহাল রয়েছে উল্লেখ করে তিনি ওই অগ্নিকাণ্ড নাশকতার অংশ কি না এবং এ ঘটনায় কোনো তদন্ত হয়েছে কি না, তা জাতির সামনে প্রকাশের দাবি জানান।
দেশীয় কয়লা ব্যবহারের দাবি
দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, পায়রা, রামপাল, বাঁশখালী ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভৌত সক্ষমতা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সঞ্চালন লাইনও প্রস্তুত আছে।
নিয়মিত কয়লা সরবরাহ ও এলসি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে এসব কেন্দ্র থেকে দ্রুত সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।
দেশীয় কয়লার গুণগত মান বা হিট বেশি হওয়ার দোহাই দিয়ে তা ব্যবহার না করে ফেলে রাখা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, অন্যদিকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করা হচ্ছে। দেশীয় কয়লা ব্যবহারে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠনেরও আহ্বান জানান তিনি।
ক্রুড অয়েল আমদানিতে সাশ্রয়ের প্রস্তাব
তেল খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল আমদানি ও শোধন নিশ্চিত করা গেলে বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং সচল রাখলে আরও ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
তবে সঠিক তদারকির অভাবে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রায়ই কাঁচামালের অভাবে বন্ধ থাকে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিল্পকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ
বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব দেন নাজিবুর রহমান মোমেন। তিনি বলেন, শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া হলে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা তৈরি হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল থাকবে এবং শিল্পখাতকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
নবায়নযোগ্য ও সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে ট্যারিফ নির্ধারণে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতিরও সমালোচনা করেন তিনি। তার দাবি, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনে লোকসানের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং মাত্র ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ ক্রয়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন না।
ছয় মাস, তিন বছর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সংকট উত্তরণে ছয় মাসের স্বল্পমেয়াদি, তিন বছরের মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন নাজিবুর রহমান মোমেন। স্বল্পমেয়াদে দুটি এফএসআরইউ পূর্ণ ক্ষমতায় চালু রাখা, জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি কেনা এবং বিদ্যুৎ, সার ও রফতানিমুখী শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের তাগিদ দেন তিনি।
মধ্যমেয়াদে ভোলা, জামালপুর, জকিগঞ্জ ও নোয়াখালীর গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, নতুন কূপ খনন কর্মসূচি জোরদার করা এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস এলএনজিতে রূপান্তর করে সরবরাহ করা হলে এর ব্যয় ১০ থেকে ২০ গুণ বেড়ে যাবে। তাই এ ধরনের ব্যয় এড়ানো দরকার।
‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠনের দাবি
বক্তব্যের শেষাংশে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, হাইকোর্ট ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিশেষ আইনকে অবৈধ ঘোষণা করলেও বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সালিশে নেওয়া বা যাচাই করার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে শক্তিশালী ‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া পরিশোধে স্বচ্ছ রোডম্যাপ তৈরি, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বার্ক) শক্তিশালী করা এবং এলএনজি ও জ্বালানি খাতের সব ধরনের কেনাকাটায় জড়িতদের দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
একইসঙ্গে অন্তত তিন মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানির নিজস্ব মজুত গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন এই সংসদ সদস্য।









