এপিবিএনকে সাইবার অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে নতুন আইন

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৩৫আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৩৫

সাইবার অপরাধ, সন্ত্রাস, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মানবপাচার, গুম ও ভূমিদস্যুতাসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে (এপিবিএন) আরও বিস্তৃত দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রেখে নতুন আইন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এপিবিএনের অধীনে সাইবার সেল গঠন, অপরাধ তদন্তের জন্য হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।

‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি পরীক্ষা করে সংশোধিত আকারে সংসদে পাসের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করেছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর কমিটির বৈঠকে বিলটি পরীক্ষা করা হয়। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কমিটির সুপারিশ করা বিলটি উপস্থাপন করেন বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন।  

প্রস্তাবিত আইনে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন আইন করার কথা বলা হয়েছে। এতে এপিবিএনের সাংগঠনিক কাঠামো, দায়িত্ব, ক্ষমতা, তদন্ত, শৃঙ্খলা, বিচার ও দণ্ডের বিধান নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্থায়ী কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, কমিটি বিলটি বিভিন্ন দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে একটি সংশোধনী সুপারিশ করেছে। বিলের দফা-৪-এর উপদফা (১)-এর দ্বিতীয় লাইনে ‘ব্যাটালিয়ন’ শব্দটির পর ‘(এপিবিএন) প্রতিষ্ঠা,’ শব্দগুলো, বন্ধনী ও কমা সন্নিবেশের সুপারিশ করা হয়েছে।

সাইবার সেল গঠনের সুযোগ

প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএনের অধীনে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন (এসপিবিএন), পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়নসহ অন্য ব্যাটালিয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কার্য সম্পাদনের সুবিধার্থে ইউনিটে সাইবার সেল গঠন করা যাবে।

এপিবিএনের প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

এ ছাড়া প্রশাসনিক ও আইনি বিষয় সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য আইনজীবী, মনোবিদ, চিকিৎসক, বিচার বিভাগীয় সদস্যসহ প্রয়োজনীয় নন-পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি অথবা প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সন্ত্রাস থেকে গুম-ভূমিদস্যুতা

বিলে এপিবিএনের দায়িত্ব ও কার্যাবলির পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জননিরাপত্তা রক্ষা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার ঘোষিত ভিআইপি ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার।

এ ছাড়া মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বও এপিবিএনের ওপর থাকবে।

আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে এপিবিএন।

তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা

প্রস্তাবিত আইনে ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান অন্যান্য আইন অনুসরণ করে কোনও স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা এপিবিএনকে দেওয়া হয়েছে।

এপিবিএনের কোনও সদস্য কাউকে গ্রেফতার করলে বা কোনও আলামত জব্দ করলে তা অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানার হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করতে হবে। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদনও দিতে হবে।

আবার আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক যেকোনও সময় এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শককে কোনও ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে পুলিশ উপপরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নন—এমন কোনও সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে।

এপিবিএনের নিজস্ব দুই ধরনের আদালত

বিলে এপিবিএন সদস্যদের অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদালত এবং সংক্ষিপ্ত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদালত—দুই ধরনের আদালত গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

বিশেষ আদালতে বিদ্রোহ সংগঠন, বিদ্রোহে প্ররোচনা, বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ দমনে যথাযথ চেষ্টা না করা, বিদ্রোহীদের সহায়তা করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর অপরাধজনক বল প্রয়োগের মতো অপরাধের বিচার হবে।

এসব অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে সমপরিমাণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, পোশাক বা যানবাহনের অংশবিশেষ নষ্ট করা বা হারিয়ে ফেলা, কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল হওয়া, ডিউটি পোস্ট বা টহল পরিত্যাগ, প্রহরারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনানুগ আদেশ অমান্য, চাঁদা আদায়, সম্পত্তি লুট বা ধ্বংসসহ বিভিন্ন অপরাধের বিচার হবে সংক্ষিপ্ত আদালতে।

এসব অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং আর্থিক ক্ষতির ক্ষেত্রে সমপরিমাণ অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

৯০ দিনের বেশি কারাদণ্ড হলে চাকরি যাবে

বিলে বলা হয়েছে, কোনও এপিবিএন সদস্য ৯০ দিনের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বলে গণ্য করা হবে।

বিশেষ আদালতের দণ্ডের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এবং সংক্ষিপ্ত আদালতের দণ্ডের বিরুদ্ধে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে বিশেষ ও সংক্ষিপ্ত আদালতের কার্যধারা, রায়, আদেশ, দণ্ড বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্য কোনও আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করতে পারবেন।

গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশেও বিধিনিষেধ

প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএন সদস্যদের গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনও সদস্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনও ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রে কোনও তথ্য বা দলিল প্রকাশ করতে পারবেন না। প্রকাশে সহযোগিতা করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য বরখাস্তসহ বিভিন্ন দণ্ড

বিভাগীয় কার্যধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে সদস্যকে চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ এবং বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্তের মতো গুরুদণ্ড দেওয়া যাবে।

লঘুদণ্ড হিসেবে জরিমানা, তিরস্কার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য কোয়ার্টার গার্ড বা ব্যাটালিয়নে আটক রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অতিরিক্ত ড্রিল বা দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনও সদস্যকে এসব দণ্ড দেওয়া যাবে না।

 ১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশ রহিত

প্রস্তাবিত আইনে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রহিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে পুরোনো অধ্যাদেশের অধীনে করা কাজ, গৃহীত ব্যবস্থা, চলমান মামলা, আবেদন বা আপিল এবং বিদ্যমান বিধি, প্রবিধান, আদেশ ও প্রজ্ঞাপন নতুন আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে বহাল রাখার বিধান রয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালে গঠনের পর এপিবিএনের দায়িত্ব ও কার্যাবলি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে সাইবার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা, মানবপাচার, জলবায়ু পরিবর্তন ও বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিজনিত নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এপিবিএনের সাংগঠনিক কাঠামো, দায়িত্ব, ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার আইনগত কাঠামো যুগোপযোগী করতেই নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

/এসএমএ/আইএএম/
সম্পর্কিত
শিল্প বাঁচাতে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার ‘ওপেন অ্যাক্সেসের’ প্রস্তাব জামায়াতের
সাবেক মালিকদের ব্যাংক ফেরত পাওয়ার সুযোগ রাখা ১৮ক ধারা বিলুপ্ত হচ্ছে
জ্বালানি সংকট আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ভুল নীতির’ ফল: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
শিল্প বাঁচাতে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার ‘ওপেন অ্যাক্সেসের’ প্রস্তাব জামায়াতের
শিল্প বাঁচাতে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার ‘ওপেন অ্যাক্সেসের’ প্রস্তাব জামায়াতের
একীভূত পাঁচ ব্যাংক থেকে এক দিনে ২৫০ কোটি টাকা তুলেছেন ৬ হাজার গ্রাহক
একীভূত পাঁচ ব্যাংক থেকে এক দিনে ২৫০ কোটি টাকা তুলেছেন ৬ হাজার গ্রাহক
ইরান যুদ্ধে মার্কিনিদের অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ ১০০ বিলিয়ন ডলার
ইরান যুদ্ধে মার্কিনিদের অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ ১০০ বিলিয়ন ডলার
গ্রামে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, মিথ্যা আশ্বাসে সংকট আড়াল করা যাবে না
সংসদে জামায়াত আমিরগ্রামে ১২-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, মিথ্যা আশ্বাসে সংকট আড়াল করা যাবে না
সর্বাধিক পঠিত
শিশু কোলে ছবি দিয়ে পরীমণি বললেন ‘তিন নম্বর জন ডান’
শিশু কোলে ছবি দিয়ে পরীমণি বললেন ‘তিন নম্বর জন ডান’
হেলিকপ্টার থেকে নামা ব্যক্তিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা ওসির, পরে যা বললেন
হেলিকপ্টার থেকে নামা ব্যক্তিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা ওসির, পরে যা বললেন
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
আমিরাতে ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের নিয়ে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী
আমিরাতে ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের নিয়ে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ