চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে এ দাবি জানান জোট নেতারা। সমাবেশে ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ব কারখানা দেশি-বিদেশি লুটেরাদের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্তে তীব্র নিন্দা জানানো হয়। আগামী ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি (স্কপ চট্টগ্রাম) সমর্থিত কর্মসূচির প্রতি সর্বাত্বক সমর্থন জানান নেতারা। এছাড়া ৩০ অক্টোবর ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জোটের সমাবেশ সফলের আহ্বান জানান তারা।
জোটের কেন্দ্রীয় নেতা ও বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিপিবি সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাম্যবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু। সমাবেশে পরিচালনা করেন বাসদের (মাহাবুব) কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড মহিনউদ্দিন চৌধুরী লিটন।
সমাবেশে নেতারা লাভজনক এনসিটি ইজারার লক্ষ্যে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির গত ১ অক্টোবরের বৈঠকে খসড়া কনসেশন চুক্তি অনুমোদনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান।
তারা বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। বিদেশি কোনও কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া হবে এবং চুক্তিতে কি কি শর্ত রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে দেশবাসীকে কিছুই জানানো হয় না । পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়ার চর ও কেরানীগঞ্জে পানগাঁও টার্মিনাল তড়িঘড়ি করে অতিগোপনে বিদেশি অপারেটরকে ইজারার চুক্তি করেছে। এর আগে প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক জনগণের আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তী সরকার এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে পারেনি।
তারা বলেন, সরকার বিদেশি অপারেটরের নাম প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানী ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এ চুক্তি হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিনা দরপত্রে যে প্রতিষ্ঠানকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের হাতে এনসিটি তুলে দিতে অন্তর্বর্তী সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং নির্বাচিত বিএনপি সরকারও ফ্যাসিবাদী সরকারের নেয়া জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী সিদ্ধান্ত বাস্তনায়ন করছে। যা গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী।
নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে শুধু দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থই জড়িত নয়, এর সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ও যুক্ত। দেশীয় অর্থায়নে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এনসিটি নির্মাণ এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৪৪ শতাংশ কনটেইনার ওঠানামা এই টার্মিনালের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এমন একটি লাভজনক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনালের পরিচালনা কেন বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দিতে হবে,সে প্রশ্নও তোলেন তারা।
বাম নেতারা আরও বলেন, এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হলে বন্দরের রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সরকার বিদেশি পুঁজির স্বার্থে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি) এ প্রকল্পের লেনদেনবিষয়ক পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের যাচাই-বাছাই, চুক্তির কাঠামো ও চুক্তিপত্র তৈরি এবং নির্বাচিত অপারেটরের সাথে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দেশের বন্দর ব্যবহারকারী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসির পরামর্শ কেন সরকার অনুসরণ করবে, সে প্রশ্নও তোলেন নেতৃবৃন্দ। এনসিটির মতো জাতীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে তা রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালনার দাবি জানান তারা। চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে নৌ-মন্ত্রণালয় থেকে ইনভেস্ট বাংলাদেশকে নির্দেশ দেওয়ারও তীব্র নিন্দা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী অপতৎপরতা বন্ধের দাবি জানান তিনি।
নেতৃবৃন্দ এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম একলাফে ২৫২ টাকা বৃদ্ধি করে জনদুর্ভোগ বাড়ানোরও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের দাবি করেন এবং বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া কনসেশন চুক্তিসহ অন্তর্বর্তী সরকারের করা লালদিয়া ও পানগাও ইজারা চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত অসম বানিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান। একইসাথে বন্দর শ্রমিকসহ সর্বস্তরের জনগণকে সরকারের গনবিরোধী সকল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।