এ পেশায় কীভাবে এলেন জিজ্ঞেস করতেই বলেন, মা ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে। তিনি এই পেশায় দিতে চাননি আমাকে। ১৯৭৬ সালে যখন এই পেশায় আসি তখন মা জিজ্ঞেস করেছিলেন,ওখানে রাতের বেলায় কি ছেলে মানুষ থাকে, বলেছি না মা,জিজ্ঞেস করেছেন-তুমি কি রাতের বেলায় সিনেমা দেখতে যাও? তুমি কি হিন্দুদের সঙ্গে খাও? তুমি কি নামাজ পড়ো? খুব কনজারভেটিভ ছিলেন,তবে তাকে খুব ভালোভাবে কনভিন্সড করেই আমি এ পেশায় এসেছি,বললেন আয়েশা সিদ্দীকা।
আরও পড়তে পারেন: রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করলো তুরস্ক
আর আমারও আগে ধারণা ছিল,যেসব মেয়ের বিয়ে হয় না,কিংবা স্বামী মরে গেছে অথবা যাদের যাবার কোনও জায়গা নেই আর যারা বিশেষ করে নন মুসলিম-তারাই কেবল এ পেশায় আসেন।তবে আমার ছোট বোন একবার অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসি, তখন নার্সদের পোশাকটা আমাকে খুব আকৃষ্ট করলো, মনস্থির করলাম আমিও এই পোশাক পরবো, এই পেশায় আসবো-বিয়ে হলে হবে, না হলে নাই। তবে জীবনের অনেক বড় অর্জন হলো,আমার মাকে আমি নার্সিং সেবা দিতে পেরেছি। তিনি পাঁচ থেকে ছয় বছর বিছানায় ছিলেন,আমার মনের মতো করে তার সেবা করেছি-আমার মনে হয় তার সেবা করার জন্য তখন সেই প্রতিকূলতা পার হয়ে এই পেশায় এসেছিলাম,নয়তো এটা সম্ভব হতো না। তবে বাবাকে সেবাটা দিতে পারিনি, হঠাৎ করেই মারা যান তিনি।
তবে সবাই এক রকম হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, নতুনদের বলবো,তারা যেন সত্যিকারের সেবিকা হয়ে উঠতে পারেন।নার্সিং কোনও প্রফেশন না,ধর্ম-এটা মনে রাখতে হবে। যেহেতু মানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করা হয় এ পেশায়, মনপ্রাণ উজার করে তাদের সেবা করতে হবে রোগীদের, বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন আয়েশা সিদ্দীকা। বলেন, কতো কিছু দেখেছি এই পেশায় এসে।
কোনও বিব্রতকর,কষ্টকর কিংবা দুঃখজনক ঘটনা কি ঘটেছে জীবনে-প্রশ্ন করতেই বলেন,দুঃখজনক অভিজ্ঞতা অনেক হয়েছে, কষ্ট পেয়ে কেঁদেছি, তবে সেসব এখন আর বলবো না। সব কথা সবসময় বলা যায় না, বলেন আয়েশা সিদ্দীকা। সহনীয়তা এখানে বড় কথা,সহনশীল হয়েই নার্সিং প্রফেশনে আসতে হবে,বলেন তিনি। নার্সিং প্রফেশন আমার কাছে পূত-পবিত্র আর রোগী আমার মসজিদ-মন্দির-এখন পর্যন্ত আমি এই ব্রত নিয়েই আছি।
এদিকে, বিশ্ব নার্সিং দিবসে পুরস্কার পাওয়া একমাত্র পুরুষ আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম, ত্রিশ বছরের ওপরে নার্সিং পেশায় জড়িত নার্সিং সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে।তার শুরুটা হয়েছিল সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১৯৮০ সালে।
জাতিসংঘ মিশনে রুয়ান্ডা, লাইবেরিয়া এবং সর্বশেষ কাজ করেছেন কুয়েতে প্রায় সাত বছর। দেশে ফিরেই ২০০৩ সালে যোগ দেন ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে। এখনও সেখানেই আছেন, আর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ এবছর বিশ্ব নার্স দিবসে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির দেওয়া পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।১২ জন নার্সের মধ্যে নজরুল ইসলাম গত ছয় বছরে একমাত্র এবং প্রথম পুরুষ হিসেবে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন।
এতো বছর আগে নার্সিং পেশা কেন শুরু করেছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষের সেবা করতে চাইতাম ছোটবেলা থেকেই। বড় হতে হতে বুঝতে পারলাম,মানুষের সেবা করার অন্যতম একটি উপায় হলো, নার্সিং পেশা। পরে সেই ইচ্ছে অনুযায়ী পেশা হিসেবে বেছে নেই নার্সিংকে।
আরও পড়তে পারেন: পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ, আনুষ্ঠানিক পত্র হস্তান্তর
পুরস্কার পেয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন, কাজের স্বীকৃতি পেলে সবারই ভালো লাগে, আমারও লাগছে। নতুনদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নতুনদেরকে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মানানসই হতে হবে, নার্সিং পেশার মূলমন্ত্র হলো ধৈর্য,অসীম ধৈর্যশালী না হলে এ পেশায় আসা উচিত না,এই বিষয়টা মাথায় রেখে নতুনদেরকে কাজে আসার পরামর্শ দেন নজরুল ইসলাম।
দেশের বাইরে কাজ করার অভিজ্ঞতা দেশেও তিনি কাজে লাগাচ্ছেন জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের চেয়ে ওদের চিকিৎসা ব্যবস্থাটাই অনেক উন্নত,সেসব অভিজ্ঞতা নিজের কাজে লাগাচ্ছি, অন্যদের শিখিয়েছি, নতুনদের জন্য আমার দরোজা সবসময় খোলা, যে কেউ আমার কাছে আসতে পারেন কাজের জন্য। মানবধর্মকে ভালবেসেই এখানে আসতে হবে-নয়তো আসা উচিত না বলেন তিনি।
/এমএসএম /