গত মাসে ধানমন্ডির এক হাসপাতালে মারা যান মিথিলা।পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলাতেই মারা যান মিথিলা। তার চেয়েও বড় অভিযোগ,মিথিলার অপারেশন নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু সময় মতো প্রধান চিকিৎসক না আসতে পারায় তিনি ফোনেই তার সার্জারি টিমের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তাকে অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার কথাও তিনি ফোনেই বলেন। আর তখনই একটা ভুল হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
আরও পড়তে পারেন: শ্যামল কান্তিকে ঢাকা মেডিক্যালে ঢুকে হত্যার আহ্বান ফেসবুকে!
অপরদিকে, দুই বছর বয়সী রিভ আল সায়ারের বয়স যখন ১১ মাস,তখন পেট খারাপ হওয়াতে তাকে নেওয়া হয় বাসার পাশের এক হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি করার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে শিশুটির পায়ে ক্যানোলা করা হয়। শিশুটির বাবা শেরিফ আল সায়ার বলেন,ডিউটিরত ডাক্তারের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন,আমি ম্যাডামের সঙ্গে ফোনে কথা বলেই সব করছি। আমাকে জানানো হলো,প্রধান চিকিৎসকের সঙ্গে ফোনে সব ডিসকাস করেছেন। ক্যানোলা করে স্যালাইন দিতে বলেছেন তিনি। পরে রাত ১০ টায় সেই চিকিৎসক এলেন। তাকে সব জানানোর পর তিনি বললেন,স্যালাইনটা চলুক,আমি ফোনে সব শুনেছি।
শেরিফ বলেন, আমার ছেলে ওই রাতেই অনেকটা সুস্থ্য হয়ে যায়। পরদিন সকালে আমি ডিউটিরত চিকিৎসককে বললাম, ছেলে তো ইম্প্রুভ করেছে, আমরা তাকে রিলিজ করে নিয়ে যাই। বাসা তো কাছেই্। সমস্যা হলে আবার নিয়ে আসবো। কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত তারা দিলেন না,আটকে রাখলেন। দুপুরে আবার জিজ্ঞেস করায় আমাকে জানানো হলো,ম্যাডামের সঙ্গে কথা হয়েছে, তিনি আসার পর সিদ্ধান্ত হবে। সেই ডাক্তার ম্যাডাম এলেন রাত ১০ টায়। যার জন্য আমাকে দুইদিনের কেবিন খরচ গুনতে হলো।
অপরদিকে, রাজধানীর উত্তরার এক হাসপাতালে চিকিৎসক না এসে শুধু ফোনে ফোনেই নার্সের মাধ্যমে জরুরি রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ায় তিন দিনের শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগে একজন করে নিজস্ব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকবেন এবং তিনি তার দায়িত্ব পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে একেকটা হাসপাতাল অন-কলে অনেক চিকিৎসকদের নিয়ে আসেন। কিন্তু যেই চিকিৎসক অন-কলে আসেন তিনি তো তার সময়মতো আসবেন না- সমস্যাটা এখানেই হয় জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাসকুলার বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. সাকলাইন রাসেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,আমি যে হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সব সময় থাকবো, রোগীদের ট্রিট করবো, আরেকটি অন-কলের হাসপাতালে সেভাবে থাকবো না,রোগীদের সেভাবে ট্রিট করতে পারবো না। ফলে ওই সময়ে একজন ডিউটিরত ডাক্তারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে একজন চিকিৎসককে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চব্বিশ ঘণ্টা হাসপাতালে থাকবেন এটাও নিয়ম না বা জরুরি না। কিন্তু সেই জরুরি মুহূর্তে যেন চিকিৎসক আসতে বাধ্য থাকেন সেই নিয়মটি থাকা উচিত হাসপাতালগুলোতে। কারণ, রোগীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে হাসপাতাল ব্যবসা করতে পারবে না। এখানে কোনও সুযোগ নাই ফাঁক রাখার। কিছু কিছু হাসপাতাল অন-কলে চিকিৎসক রাখে, সেখানে তো অবশ্যই রোগীরা সাফার করে। অবশ্যই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরও পড়তে পারেন: রোয়ানুর আঘাতে উপকূল লণ্ডভণ্ড, নিহত ২০
ডা. সাকলাইন বলেন,চিকিৎসা ব্যবস্থাতেই এই পরিবর্তনটা আসতে হবে। একজন চিকিৎসকের নৈতিকতাতেও এটা থাকা উচিত যে, তিনি যেখানে জরুরি সময়ে যেতে পারবেন না, সেখানে অন-কলে যাবেন না। রোগীকে কেবল দেখে চলে গেলাম, কিন্তু তার জরুরি সময়ে আমাকে খুঁজে পাবে না – এই কাজটা করা যাবে না, যারা নৈতিকতা মেনে চলেন তারা অন্তত এই কাজটা করবেন না বলেই আমার বিশ্বাস। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবশ্যই সে সুযোগ নাই, কারণ রোগীর যে কোনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার মতো পর্যাপ্ত জনবল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ সব থাকতে হবে ডিউটিরত চিকিৎসকদের পাশাপাশি,বলেন তিনি।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন সহযোগী চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একজন চিকিৎসক যখন চার জায়গাতে চেম্বার করবেন তখন তার পক্ষে কিছুতেই সেবার মানসিকতা নিয়ে রোগী দেখা সম্ভব নয়। রোগীদেরকে এখন আমরা সময় নিয়ে চিকিৎসা দিতে পারি না, কারণ হাতে সময় খুব কম। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। রোগীর ভরসার জায়গায় সৃষ্টিকর্তার পরেই থাকেন একজন চিকিৎসক – এ জিনিসটা মাথায় রাখতে হবে আমাদের।
জেএ/এমএসএম/