দুই বছর আগে জঙ্গিদের হাতে নিহত মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার তদন্ত চলছে ধীরগতিতে। কবে নাগাদ এ মামলার তদন্ত শেষ হবে তা জানাতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ইন্ধন ও উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পর গ্রেফতার হওয়া আনসারুল্লাহর আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে পরিচিত শায়খ মোযাফফর বিন মুহসিনও এখন জামিনে। এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো ছয় জেএমবি সদস্য এখন কারাগারে।
রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন চ্যানেল আই-এর কাফেলা অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও হাইকোর্ট মাজার মসজিদের খতিব মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী। খুন হওয়ার পরপরই গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, মতাদর্শগত কারণে আনসারুল্লাহ’র স্লিপার সেলের জঙ্গিদের হাতে ফারুকী খুন হয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন ফারুকীর ছেলে ফয়সাল ফারুকী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আট-নয় জনকে আসামি করে শেরেবাংলানগর থানায় হত্যা ও ডাকাতির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রথমে থানার ইনসপেক্টর (তদন্ত) মুন্সী ছাব্বির আহম্মদ তদন্ত করলেও পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে। মামলাটি ডিবিতে স্থানাস্তরের পর এর তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ইনসপেক্টর জুলহাস উদ্দিন আকন্দকে। মামলাটির তদারকির দায়িত্ব পালন করেন গোয়েন্দা পুলিশের তখনকার যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামসহ কয়েকজ ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
তখন গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ফারুকী হত্যাকাণ্ডে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের স্লিপার সেলের সদস্যরা জড়িত বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের এক বছরেও তারা এ মামলার তদন্তে আশানুরূপ অগ্রগতিতে যেতে পারেননি।
প্রায় এক বছর তদন্ত চালানোর সময় গোয়েন্দা পুলিশ ফারুকী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে পরিচিত শায়খ মোযাফফর বিন মুহসিনসহ আনসারুল্লাহর তিনজন, জেএমবি'র সাতজন ও হরকাতুল জিহাদের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে উস্কানিদাতা হিসেবে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় শায়খ মোযাফফর বিন মুহসিনকে। এছাড়া তারিকুল ইসলাম মিঠু ওরফে তারেক, আবদুল গাফফার, আলেক বেপারি, মিন্টু প্রধান, আলেক বেপারীর ভায়রা মোস্তফা আহমেদ রাসেল ও খোরশেদ আলমকে গ্রেফতার দেখানো হয়। মুহসিন ছাড়া অন্য সবাই কারাগারে আছেন এবং তারা জেএমবি’র সক্রিয় সদস্য বলে জানান তদন্তে সংশ্লিষ্টরা।
হত্যাকাণ্ডের পরপর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া থেকে মাহমুদা বেগম ও শরীফুল ইসলাম এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে মো. ইউসুফ নামের তিনজনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার কোনও তথ্য পাননি গোয়েন্দারা। তারা ছিলেন ফারুকীর ভক্ত। গ্রেফতার হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তারা জামিনে মুক্তি পান।
গত বছরের শেষের দিকে ফারুকী হত্যা মামলাটি ডিবি থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়। সেখানে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডি’র ইনসপেক্টর আরশেদ আলী মণ্ডলকে। বর্তমানে তিনি মামলাটির তদন্ত করছেন।
বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা আরশেদ আলী মণ্ডল বলেন, আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি ও হোসনী দালানে হামলার ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তাদের অনেকেই ফারুকী হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। মাহফুজ নামের এক জঙ্গিও জড়িত থাকতে পারে বলে তার ধারণা। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে বলেও জানান তিনি। আহলে হাদিস গ্রুপের সদস্যদের হাতেই মতাদর্শগত কারণে খুন হয়েছেন বলে মনে করেন তিনি।
ইনসপেক্টর আরশেদ আলী বলেন, হজে লোক পাঠানো নিয়েও মেঘনা ট্রাভেলস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মাওলানা ফারুকীর ঝামেলা ছিল। তাদের সঙ্গে এখনও কথা বলতে পারেননি। পারিবারিক কোনও ঝামেলায় তিনি খুন হননি বলেও নিশ্চিত হয়েছেন তারা। সুনির্দিষ্ট করে সময় বলতে না পারলেও যত দ্রুত সম্ভব মামলার তদন্ত শেষ করা হবে বলে জানান তিনি।
মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীর বড় ছেলে আহমেদ রেজা ফারুকী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকসহ বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু তার বাবার খুনিদের গ্রেফতার করতে পারছেনা কেন, সেটাই জানতে চান তিনি। আহমেদ রেজা ফারুকী অভিযোগ করে বলেন, তার বাবার হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত। অথচ দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তিনি বলেন, খুনিরা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার আগেও মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়েছিল। পূর্ব পরিকল্পিতভাবেই তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নেওয়ার দাবি জানান রেজা ফারুকী।
/এমএনএইচ/
নিরাপত্তা বলয় মাথায় রেখে কয়েক স্তরে ভাগ হয়ে হামলা চালায় জঙ্গিরা