‘এ শহরে আর থাকব না’

অপারেশন স্টর্ম ২৬এ শহরে আর থাকব না, গ্রামে চলে যাব। যে শহরে  আতঙ্ক নিয়ে থাকতে হয়, পাশের বাসার ছেলেটির দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে হয়, সে শহরে আমি থাকতে চাই না। এ অবিশ্বাসের শহরে আমার সন্তানকে বড় করব কিভাবে? কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কের জঙ্গি আস্তানার ঠিক উল্টোদিকের বাড়ির মূল ফটকে দাড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরিরত আব্দুর রাজ্জাক। একমাত্র ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে তিনি এই বাসায় ভাড়া উঠেছেন চার মাস আগে।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাত একটা থেকে দেড়টার দিকে একাধারে কিছু সময় ফায়ার হচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম হয়তো প্রশাসনের কাজ এটা। আবার কিছু সময় পর ছোট ফায়ার। তখনও কিছু বুঝে উঠতে পারিনি, কোন দিক থেকে শব্দ আসছে, তাও বুঝতে পারছিলাম না। সবাই আতঙ্কিত। এলোপাথাড়ি গুলির ভয়ে বের হতেও পারছিলাম না।ভোর পাঁচটার দিকে বিকট সব শব্দ, এলোপাথাড়ি গুলি চলছিল। অ্যাপার্টমেন্টের সবাই যার যার ঘরে দরোজা আটকে বসে আছে, সকালের দিকে ধীরে ধীরে বের হই অ্যাপার্টমেন্টের সবাই। এখনও আতঙ্কে আছি।পাশেই এমন এক জঙ্গি আস্তানা, এটা ভাবতেও পারিনি।
তবে এখানে দুই-একটা ছেলে ঘুরত, এটা দেখেছি, কেমন যেন লাগতো। আর এ এলাকায় বেশিরভাগ বাসাতেই ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া, সুতরাং কিছু বোঝার উপায় নেই।

এখনও সবাই আতঙ্কিত বলে আব্দুর রাজ্জাক  জানান। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট মালিকের এখন উচিত বাসা ভাড়া দেওয়ার সময় সর্তক হওয়া।যে যখন যে বাসায় থাকবে সে বাসার প্রতিটি সদস্যের সিকিউরিটি (নিরাপত্তা) নিশ্চিত করবে বাড়িওয়ালারা-এই ধরণের কিছু একটা করা দরকার সরকারের। নয়তো কে কখন কিভাবে আমার পাশেই ওত পেতে বসে আছে, এটা  এখন অনিশ্চিত একটা বিষয় হয়ে যাচ্ছে আমাদের জন্য বলেন তিনি।

আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, জঙ্গি আস্তানার দুইটা বিল্ডিং পরেই আমার বাসা। কিন্তু আমি পুরোটা দেখেছি, কারন জঙ্গি আস্তানাটা ছয় তলায়, পাশের দুইটা বিল্ডিং দ্বোতলায়, আর আমার বাসা তিনতলায়।মাঝের জায়গাটা ফাঁকা থাকায় আমি জানালার পাশে ওদের হাঁটাহাঁটি দেখেছি, স্লোগান  শুনেছি।

ইসলামের পক্ষে তারা স্লোগান দিচ্ছিল।মাঝে মধ্যে গুলির শব্দ শুনেছি, তখনও তেমন ছিল না। এরপর শেষ রাতের দিকেতো অভিযান। কতক্ষণ পরপরই তারা স্লোগান দিচ্ছিল। বলছিলেন, ব্যবসায়ী বজলুর রহমান।

জঙ্গি আস্তানার পাশেই তার বাসা। তিনি দেখেছেন রাতে জঙ্গিরা জানালার পাশে হেটেছে, স্লোগান দিয়েছে। তিনি বলেন, জঙ্গিরা জানালার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলছিল,  আমরা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করব যে কোনও মূল্যে, তোমরা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা না পারলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা জানি তোমরা আমাদের মেরে ফেলবে, কিন্তু আমরা মরার জন্য প্রস্তুত। আর আমাদের মারলে তোমরা দোজখে যাবে আর আমরা বেহেশতে যাব, আমাদের কোনও ভয় নেই, আমরা ইসলামের জন্য জীবন দেব, আমরা শহীদ হবো।তারা হাঁটাহাঁটি করছিল, স্লোগান দিচ্ছিল, চেহারাটা পুরোটা দেখতে না পারলেও দেখেছি, কারও খোঁচা-খোঁচা একটু দাড়ি আছে।খুব শুদ্ধ ভাষায় বজ্রকণ্ঠে তারা স্লোগান দিচ্ছিল।  

ব্যবসায়ী বজলুর রহমান বলেন, কল্যাণপুরে এমন ঘটনা হবে, আমি একটু অবাকই হয়েছি।এখানে থাকি ১৯৮৯ সাল থেকে।কখনও এমন কিছু হয়নি আগে। অথচ আমার পাশেই এমন আস্তানা। আতঙ্কিত না তবে খুব অবাক হয়েছি, বিচলিত হয়েছি বলেন তিনি।

আরও পড়তে পারেন

কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযান শুরু, মুহুর্মূহু গুলির শব্দ

/এমএনএইচ/