গত ৬ মার্চ বনানী থানায় মামলা হওয়ার পর থেকেই রেইনট্রি কর্তৃপক্ষ বলে আসছিল, সব তথ্য পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। তাদের কাছে যেসব ফুটেজ ছিল তাও সব চেক করেছেন বনানী থানার তদন্ত কর্মকর্তা। আসামিদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জন্য করা বুকিং অনুযায়ী তারা হোটেলে প্রবেশ করেছিল। ৭০১ ও ৭০২ নম্বর কক্ষ তারা ভাড়া নিয়েছিল। কিন্তু আবার পরক্ষণেই বলছে, তাদের কক্ষ বুকিং নেওয়ার বিষয়টি রেজিস্ট্রারে উল্লেখ নেই। ধর্ষকরা তরুণীদের সঙ্গে কী করেছে ও সুইমিংপুলে কী হয়েছিল, সেসব প্রশ্নের কোনও জবাব দেয়নি। রেজিস্টারে কার নামে বুকিং দেওয়া হয়েছিল সাংবাদিকরা জানতে চাইলেও তারা কোনও তথ্য দিতে রাজি হয়নি।
হোটেলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘হোটেলের আর্থিক ব্যবসার কথা চিন্তা করেই মিডিয়ার কাছে কিছুই বলতে চাননি তারা। এছাড়া যেখানে পুলিশের মাধ্যমে সবকিছু ম্যানেজ করা সম্ভব হচ্ছে, সেখানে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কোনও কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল হোটেল কর্তৃপক্ষ। তবে ভিকটিমকে সঙ্গে নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের তথ্য প্রকাশ হওয়ায়, হোটেল কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমে নিজেদের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।’
রেইনট্রি’র কর্মকর্তারা জানান, এই হোটেলের মালিকের নাম বজলুল হক হারুন। তিনি ঝালকাঠী জেলার রাজাপুর উপজেলার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হোটেলের সিসিটিভির বাইরেও হোটেলে যাতায়াতকারীদের ফুটেজ রাস্তার একাধিক সিসিটিভির ক্যামেরায় ধারণ করা আছে। হোটেলে প্রবেশ গেটের ডান পাশের সড়কে অবস্থিত সড়ক বাতির স্ট্যান্ডে দু’টি সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো দেখা গেছে। এর একটি ক্যামেরা হোটেলে প্রবেশকারীদের দিকে তাক করা আছে। ধর্ষণের আগে ওই হোটেলে দুই তরুণীর সঙ্গে কারা প্রবেশ করেছিলেন, তার সবই ধারণ করা ছিল ওই ক্যামেরায়।
সড়ক বাতির স্ট্যান্ডের সঙ্গে লাগানো ওই দু’টি কামেরার নিয়ন্ত্রক কারা, জানতে চাইলে বনানী থানার ওসি (তদন্ত) আবদুল মতিন বলেন, ‘সবকিছুই আমরা পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা করব।’ এর বাইরে আর কোনও তথ্য দিতে চাননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোটেলের জিএম ফ্রাঙ্ক ফরগেট এড়িয়ে যান। হোটেলের সিসিটিভিতে ফুটেজ না থাকার বিষয়ে একমাসের বেশি সময়ের পর সংরক্ষণ না করার অজুহাত তুলে ধরেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মামলার সঠিক তদন্তের স্বার্থে পর্যাপ্ত তথ্য সংরক্ষিত আছে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া, পুলিশের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। তবে মামলার হাই প্রোফাইল আসামিদের সঙ্গে বনানী থানা পুলিশের আগে থেকেই সখ্য থাকায় তারা সঠিক তদন্ত করতে পারছিল না। এছাড়া, বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর তদন্তের নৈতিক সাহস হারিয়ে ফেলেছে তারা।
যদিও মামলার প্রধান আসামি সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দাবি করেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কোটি কোটি টাকা দিয়েও কাজ হবে না। ২৫ কোটি টাকা দিয়েও ধামাচাপা দেওয়া যায় না ।’
সূত্রমতে, মামলা দায়েরের শুরু থেকেই নানা অভিযোগের তীর গুলশান ডিভিশনের পুলিশ কর্মকর্তাদের দিকে। আসামিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিযান পরিচালনার কথা গণমাধ্যমে বলা হলেও মূলত তারা কোনও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
আসামি ধরার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি থাকার কথা, তেমন কিছুই দেখা যায়নি। এমনকি অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের কারও কাছেই হ্যান্ডকাফ পর্যন্ত দেখা যায়নি।
বাইরের গেট বন্ধ করে বাড়ির ভেতরে দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর কর্মকর্তাদের বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মচারীদের কাছ থেকে একজন কর্মকর্তাকে নোট দিতে দেখা যায়। আরেকজন কর্মকর্তা তখন মোবাইল ফোন কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন।
এমন অভিযানের উদ্দেশ্য কী মিডিয়া কাভারেজ, নাকি আইওয়াশ- এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে দুই কর্মকর্তা হাসতে হাসতে মোটরসাইকেলে করে চলে যান। যাওয়ার সময় বলে যান, ‘অন্য আসামিদের বাড়িতে যেতে হবে।’
এরপর বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসেন মেহেদী নামে একজন কর্মচারী। তিনি গতকাল বাংলা ট্রিবিউনের কাছে রঙমিস্ত্রির পরিচয় দিয়েছিলেন। আজ (মঙ্গলবার) তিনি কেয়ারটেকারের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তারা দিলদার হোসেনের সঙ্গে বসার ঘরে কথাবার্তা বলেছেন এবং সেখান থেকেই পুলিশ কর্মকর্তারা বেরিয়ে গেছেন।’
/এপিএইচ/