মহাখালী থেকে ‘নিখোঁজ’ ৩ তরুণ র‌্যাব হেফাজতে

গ্রেফতার দেখানো তিন তরুণসহ ৪ জনরাজধানীর মহাখালী থেকে রবিবার রাতে নিখোঁজ হওয়া তিন তরুণ এখন র‌্যাব হেফাজতে। মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) বিকালে র‌্যাব-২ এর পক্ষ থেকে পাঠানো এসএমএস ও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তিন তরুণসহ চার জনকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়। সোমবার সন্ধ্যায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। তাদের বিরুদ্ধে বিকাশের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

‘নিখোঁজ’ ওই তিন তরুণ হলেন, নাসির মিয়া (২১), রাসেল গাজী (২০) ও আবু হানিফ (১৪)। গত রবিবার রাত ১১টার দিকে মহাখালীর ওয়্যারলেস গেট এলাকা থেকে অজ্ঞাতব্যক্তিরা তাদের মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছিলেন। এ ঘটনায় তিন জনের পরিবারই রাজধানীর বনানী থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি করেছে।  বনানী থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক শাহীন মিয়া তিন তরুণের নিখোঁজের ঘটনায় জিডি দায়েরের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রাসেল গাজীনিখোঁজ তিন তরুণের পরিবারের সদস্যরা জানান, রবিবার রাত ১১টার দিকে মহাখালী ওয়্যারলেস এলাকা থেকে সাদা রঙের একটি হায়েস মাইক্রোবাসে করে তিন জনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা থানা পুলিশ ও ডিবি কার্যালয়ে গিয়েও কারও কোনও খোঁজ পাননি। তাদের গ্রেফতার বা আটক করা হয়নি বলে পরিবারের সদস্যদের জানায় পুলিশ। অন্যদিকে, রবিবার রাত থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের কাছে কেউ মুক্তিপণ চেয়ে ফোন করেনি বলেও জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

নিখোঁজ রাসেল গাজীর বাবা ফোরকান গাজী জানান, তিনি পরিবার নিয়ে মহাখালী টিঅ্যান্ডটি এলাকার বেলতলা এলাকায় থাকেন। তার ছেলে রাসেল গাজী বনানী ১ নম্বর সড়কের আইএসএস নামে একটি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ ক্যারিং (টাকা বহন) গাড়িতে কাজ করেন। রবিবার রাত ১১টার দিকে তার ছেলেকে তুলে নিয়ে যায় বলে জানতে পারেন তিনি। পরে তিনি বনানী থানায় যান। সেখানে তাদের আটক করা হয়নি জানিয়ে থানা পুলিশ ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে খোঁজ নিতে বলে। রাতে পরিবারের সদস্যরা ডিবি কার্যালয়ে গেলে পরদিন (সোমবার) যেতে বলা হয়। সোমবার সকালে ডিবি কার্যালয় থেকেও রাসেল গাজী নামে কাউকে আটক করা হয়নি বলে জানানো হয়।

ফোরকান গাজী বলেন, ‘প্রথমে থানায় জিডি করতে গেলে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু মঙ্গলবার দুপুরে জিডি নিয়েছে।’

নাসিরনিখোঁজ নাসির মিয়ার স্বজনরা জানান, নাসির গাজীপুরের মীরেরবাজার এলাকায় থাকে। সে টঙ্গীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতো। রবিবার বিকালে গাজীপুর থেকে মহাখালীতে আসার পর সে নিখোঁজ হয়।

আরেক নিখোঁজ তরুণ আবু হানিফের বাবা আব্দুর রাজ্জাক জানান, মহাখালীর ওয়্যারলেস বেলতলাতে তাদের বাসা। তার ছেলে মহাখালীর একটি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করে। রবিবার রাতে তার ছেলে বাসাতেই ছিল। নিখোঁজ আরেক তরুণ রাসেল গাজী তাকে ফোন করে ওয়্যারলেস এলাকায় যেতে বললে সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে রাসেলের সঙ্গে তাকেও অজ্ঞাতব্যক্তিরা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।

আবু হানিফআবু হানিফকে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ওয়্যারলেস গেট এলাকার যমুনা ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী আল আমিন বলেন, রবিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে সড়কে একটি সাদা হায়েস গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। দুজন ব্যক্তি আবু হানিফকে দু’পাশ থেকে ধরে ওই গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। হানিফ তার পূর্বপরিচিত হওয়ায় তিনি ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের জানান।

নতুন করে তিন তরুণ নিখোঁজ হওয়া প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল মঙ্গলবার বিকালে বলেন, ‘নিখোঁজদের অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে নিখোঁজ হয়। এ কথা আমি আগেও বলছি, এখনও বলছি, অনেকে ফিরে আসছে। আসলে সব নিখোঁজ কিন্তু নিখোঁজ নয়। আপনারা যেটা আশঙ্কা করছেন, সেরকম কিছু নয়।’

এদিকে, বিকালে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখা থেকে মোবাইল ফোনে পাঠানো বার্তায় শেরে বাংলানগর ও মহাখালী এলাকা থেকে চার তরুণকে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়। পরে র‌্যাব-২ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নাসির, রাসেল, হানিফ ও শাহাব উদ্দিন নামে চারজনকে আটক করা হয়েছে। তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। এই চক্রের সদস্যরা নিজেদের একটি নম্বরে বিকাশ করার সময় কৌশলে S.V.R. (Secret Video Recorder) ব্যবহার করে বিকাশ রেজিস্টারের ছবি তুলে নেয়। সংগৃহীত ছবি তারা গ্রুপ লিডারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার পর ওই রেজিস্টারে থাকা গ্রাহকদের মধ্যে কয়েক জনকে টার্গেট করে। এই চক্রটি কিছু ওয়েবসাইট ব্যবহার করে লেনদেন করা টাকার চেয়ে বেশি টাকার এসএমএস বানিয়ে এসএমএসটি টার্গেট করা ব্যক্তির মোবাইলে পাঠায়। যাতে ওই মেসেজের প্রেরক হিসেবে bKash লেখা দেখা যায়। পরে ওই ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে যে স্থান থেকে বিকাশ করা হয়েছে প্রতারক চক্র তাকে ওই স্থান উল্লেখ করে জানায় যে, আপনার মোবাইলে টাকাটি ভুলবশত দু’বার পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী বিকাশের অরিজিনাল মেসেজ হিসেবে তা বিশ্বাস করে প্রতারকদের আহ্বানে সাড়া দেন।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, প্রতারক চক্রটি ভুক্তভোগীকে তার নিকটাত্মীয় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাই জরুরি টাকার প্রয়োজন ইত্যাদি বুঝিয়ে দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য বাধ্য করে। টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার পর বিষয়টি ভুয়া বা প্রতারণা বলে বুঝতে পেরে প্রতারক চক্রের সদস্যদের মোবাইল ফোনে কল করলে তাদের কলার টোন হিসেবে ‘এই মুহূর্তে আপনার কাঙ্ক্ষিত মোবাইল নম্বরে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না’ শুনে টাকা ফেরত পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতাররা ফেসুবক ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে পুরনো মালামাল বিক্রির জন্য আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেয়। তারা ক্রেতাকে আকর্ষণ করার পর পণ্যের ২০ শতাংশ টাকা অগ্রিম বিকাশের মাধ্যমে পাঠানোর জন্য বলে। এ টাকা পাওয়ার পর কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য ক্রেতার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে এবং বাকি টাকা পণ্য হাতে পাওয়ার পর পরিশোধ করতে হবে। এভাবে ক্রেতা রাজি হয়ে অগ্রিম টাকা পাঠানোর পর তারা সিমটি পরিবর্তন করে ফেলে। গরিব বা নেশাগ্রস্তদের কাছ থেকে ১০০ টাকার সিম ৫০০ বা তারও বেশি টাকায় কিনে চক্রটি এই ধরনের অপরাধ করে আসছে। ফলে এই চক্রটির সঠিক ঠিকানাও চিহ্নিত করা যায় না।