সাদা পোশাকের অভিযানে ‘আটক’ ব্যবসায়ী, ২৪ ঘণ্টা পরও হদিস মেলেনি





ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম অনিকসাদা পোশাকে অভিযানে তুলে নেওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও হদিস মেলেনি ঢাকার মিরপুরের এক ব্যবসায়ীর। তার নাম জাহাঙ্গীর আলম অনিক (৩২)। থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও র্যা বের সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়ানে খোঁজ করলে তারা জানিয়েছে, জাহাঙ্গীর নামে কাউকে তারা আটক করেনি। কিন্তু নিখোঁজের পর বুধবার (৬ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতে জাহাঙ্গীরকে নিয়ে তার নিজের বাসায় তল্লাশিও করেছে একদল সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি। তারা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিলেও পরিবারের সদস্যদের সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ বা বিস্তারিত কিছু বলেনি। ফলে নিখোঁজ জাহাঙ্গীরের পরিবারের সদস্যরা খোঁজ না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পার করছেন প্রতিটি মুহূর্ত।
বহুদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকে অভিযান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ পটভূমিতে দুই বছর আগে এ ধরনের অভিযানে বিধিনিষেধ আরোপ করে কর্তৃপক্ষ। নির্দেশ ছাড়া সাদা পোশাকে অভিযান না চালানোর কথা বলা হলেও প্রায়ই তা ঘটছে রাজধানীসহ সারাদেশেই। কখনও কখনও এর সুযোগ নিচ্ছে ভুয়া পুলিশ সদস্যরাও। এছাড়া আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রেই।
বুধবার সাদা পোশাকে তুলে নেওয়া ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের ভাই শফিকুল ইসলাম বলেন, তার ভাই মিরপুর ১১ নম্বরে জেরিন মাল্টিমিডিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধ এলাকার ডি ব্লকের ৯ নম্বর লাইনের ১৩ নম্বর বাসায় থাকেন। দুই সন্তানের বাবা জাহাঙ্গীরকে বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মিথিলা ফারহানা মনি বলেন, ‘রাত ২টার দিকে একদল লোক আমার স্বামীকে নিয়ে বাসায় আসে। দরজা নক করলে আমি দরজা খুলে দিই। তারা আমার স্বামীকে পেছনের দিকে হাতকড়া পরিয়ে বাসায় নিয়ে আসে। আমি তাদের আটকের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা কিছু বলেনি। ওরা আমাদের বাসায় তল্লাশি করে। আধঘণ্টা পর যখন চলে যাচ্ছিল তখনও জাহাঙ্গীরকে ধরার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা কিছু বলেনি।’
মিথিলা ফারহানা মনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা আজ (বৃহস্পতিবার) সারাদিন থানা পুলিশ, ডিবি ও র্যা ব— সব জায়গায় তাকে খুঁজেছি। কিন্তু কেউ তাকে আটকের কথা স্বীকার করেনি। তার যদি কোনও অপরাধ থাকে, যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন তাকে ধরে তাহলে স্বীকার করতে সমস্যা কোথায়? ধরার কারণ বলবে না কেন? আর বাসাতে তল্লাশি করেও তো কিছু পায়নি। আমরা পরিবারের সবাই প্রতিটা মুহূর্ত টেনশনে পার করছি। কারণ, আমার স্বামীর গায়ে আমি আঘাতের চিহ্ন দেখেছি। তাকে মনে হয় মারধর করা হয়েছে। ভয়ে সে বাসাতে আসলেও বেশি কথা বলেনি।’
রাতে বাসায় তল্লাশির বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরের বাসার দারোয়ান রহিম বলেন, ‘রাত দেড়টার দিকে কিছু লোকজন এসে আমাকে ডেকে তোলে। আমি দরজা খুলে দিলে তারা প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে জাহাঙ্গীরের বাসায় তল্লাশি করার কথা জানায়। তাদের মধ্যে ৭ জন চারতলায় জাহাঙ্গীরের বাসায় যায়, ৬ জন নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।’
রহিম জানান, জাহাঙ্গীরকে যারা নিয়ে এসেছিল তারা একটি নোয়াহ গাড়ি, একটি প্রাইভেটকার আর ৪-৫টি মোটরসাইকেল নিয়ে আসছিল।
জাহাঙ্গীরের ভাই শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই পালসার ব্র্যান্ডের একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করতো। ওই মোটরবাইকটিও আমরা পাচ্ছি না। কারা কেন আমার ভাইকে ধরলো, বুঝতে পারছি না! আমরা সারাদিন আদালতে গিয়েও অপেক্ষা করেছি যে তাকে আদালতে পাঠায় কিনা। কিন্তু তাকে আদালতেও পাঠানো হয়নি।’
যোগাযোগ করা হলে পল্লবী থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক এনামুল হক বলেন, ‘এরকম কোনও ঘটনা আমার জানা নেই। এই নামে কাউকে গ্রেফতারের কথাও শুনিনি বা নিখোঁজের বিষয়ে কেউ আমাদের অভিযোগও দেয়নি।’ একই থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ইমরানুল ইসলাম বলেন, ‘জাহাঙ্গীর নামে কাউকে আটক বা গ্রেফতারের বিষয়টি আমার জানা নেই।’
র্যা ব-৪-এর অপারেশন অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম সজল বলেন, ‘জাহাঙ্গীর আলম অনিক নামে আমরা কাউকে আটক বা গ্রেফতারও করিনি। পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ এলাকাতেও বুধবার আমাদের কোনও অপারেশনও হয়নি।’ যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (পশ্চিম) দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তাও জানান, জাহাঙ্গীর নামের কাউকে আটকের কথা তিনি জানেন না।