নন্দন কুমারের সঙ্গে দেশে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের আফজাল। মাত্র আড়াই মাস আগে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। আফজাল বলেন, ‘যত টাকা খরচ করে গিয়েছিলাম সেটাও যদি কামাই করা যেত, তাহলে মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।’
সৌদি আরবের ‘নেশন উইদাউট ভায়োলেশন’ প্রোগ্রামের আওতায় ধরপাকড়ের কবলে পড়ে যারাই দেশে ফিরছেন, তাদের অধিকাংশেরই অভিযোগ— আকামা বা কাজের অনুমতি তৈরির জন্য কফিলকে টাকা দেওয়া হলেও কফিল আকামা করে দেননি। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে চোখ উল্টে নিয়েছেন তাদের কফিলরা। কর্মীদের দায়দায়িত্ব না নিয়ে উল্টো তাদের ভিসা বাতিল করে দেশে পাঠিয়ে দিতে বলছেন তারা (কফিলরা)। তাদের আরও অভিযোগ— আকামা থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে খালি হাতেই দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ‘ফ্রি ভিসা’র খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন তারা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, সৌদি আরবে কাজের ক্ষেত্রে শুধু আকামার মেয়াদ থাকাই যথেষ্ট নয়। এক স্পন্সরের আকামা দিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করলে সেটাও অবৈধ বলে গণ্য করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ফিরে আসা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগই তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’য় সৌদি আরব গিয়েছিলে
‘ফ্রি ভিসা’ বলে কিছু নেই
শুধুমাত্র ভিজিট ভিসা কিংবা অন্য কোনও ক্যাটাগরির ভিসাকে ‘ফ্রি ভিসা’ নাম দিয়ে যেকোনেও কাজ করার একটি পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চালু ছিল মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, দুবাই, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে এই ‘ফ্রি ভিসা’ বেশি খোঁজেন বিদেশগামী বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এসব দেশে ফ্যামিলি ভিসা, ভিজিট ভিসা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারিং ভিসা, খাদেম (গৃহকর্ম) ভিসা, কোম্পানির ভিসাসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসা দিয়ে থাকে।
যারা সৌদি আরবে গিয়ে কাজ করেন তারা আবার সেখান থেকে আত্মীয়দের জন্য এই ‘ফ্রি ভিসা’ সংগ্রহ করে পাঠান। এতদিন সেই ভিসায় গিয়ে নির্দিষ্ট কাজের বাইরে অন্য কাজ এমনকি ছোটখাটো ব্যবসাও করতেন বাংলাদেশিরা। সেক্ষেত্রে সৌদি স্পন্সরকে মাসিক ভিত্তিতে কিছু টাকা দিলেই খুশি হতেন তারা। যখন আকামা নবায়নের প্রয়োজন হতো তখন স্পন্সরই নবায়ন করে দিতো। আবার সৌদি আরবে যেসব ছোট কোম্পানির লোক নিয়োগের সক্ষমতা কম, তারা একেবারেই কম লোকের চাকরির অনুমোদন নিয়ে থাকে। ওই কোম্পানির নামে তখন শ্রমিকদের জন্য ভিসা ইস্যু হয়। পরে ওই কোম্পানির মালিকের কাছ থেকেও বাংলাদেশিরা আকামা নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করেন। ২০১৭ সালে সৌদি সরকারের ক্ষমার সুযোগ শেষ হওয়ার পর এবং ১২টি নির্দিষ্ট সেক্টরে সৌদিকরণ করার কারণে ‘ফ্রি ভিসা’য় সেদেশে গমনকারীরা হয়ে পড়েন অবৈধ। তাদের বেশিরভাগই খালি হাতে দেশে ফিরে আসেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমন অনেক সৌদি নাগরিক রয়েছে, যাদের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ভুয়া চাহিদাপত্র দেওয়া। বাংলাদেশি দালালরা এসব চাহিদাপত্র একদামে কেনেন। এরপর তাদের কাছ থেকে ওই চাহিদাপত্র কিছুটা বেশি দামে কেনেন রিক্রুটিং এজেন্সিরা। পরে সেই চাহিদাপত্র দূতাবাস থেকে সত্যায়িত করে কর্মীর জন্য ভিসা সংগ্রহ করা হয়। সেই ভিসা সৌদিগামী কর্মীর কাছে বিক্রি করা হয় দ্বিগুণেরও বেশি দামে। সৌদি আরবে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা হলেও বাস্তবে চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে সৌদি আরবে যাচ্ছেন চাকরি প্রার্থীরা।
‘ফ্রি ভিসা’র বিষয়ে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পুরুষ কর্মী পাঠানোর কোনও চুক্তি নেই। শুধুমাত্র নারী কর্মী পাঠানোর জন্য একটি সমঝোতা স্মারক আছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট কাজের চুক্তির মাধ্যমে ভিসা ইস্যু করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিসার সব খরচ নিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বহন করে থাকে।
তিনি বলেন, ‘ফ্রি ভিসা’ বলে কিছু নেই। মূলত কিছু অসাধু বাংলাদেশি স্থানীয়দের (সৌদি নাগরিক) যোগসাজশে ফ্রি ভিসার নামে প্রতারণা পদ্ধতি চালু করেছে। শুধু সৌদি আরবই না, আসলে মধ্যপ্রাচ্যে ‘ফ্রি ভিসা’ বলে কিছু নেই।
১৭ মাসে অবৈধ চিহ্নিত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী
দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, সৌদি সরকার সেদেশে অবৈধ কর্মীদের সাধারণ ক্ষমা গ্রহণের সুযোগ দিয়েছিল তিন বার। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ৭ লাখ ৯৯ হাজার ১৮৬ জন বাংলাদেশি কর্মী সেই সুযোগের জন্য আবেদন করেছিলেন। সৌদি সরকার ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পুনরায় প্রবাসী কর্মীদের সাধারণ ক্ষমার সুযোগ দেয়। এরপর আর সৌদি সরকার ক্ষমার সুযোগ দেয়নি। এসময় সৌদি ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে জেল জরিমানা ছাড়াই ৪২ হাজার অবৈধ কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ওই কর্মসূচির অধীনে যারা সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণ করেনি, তাদের জন্য সৌদি সরকার ‘নেশন উইদাউট ভায়োলেটরস’ নামে একটি প্রোগ্রাম চালু করে। ওই প্রোগ্রামের আওতায় সৌদি সরকার আকামা, বর্ডার ও শ্রম আইন ভঙ্গকারীদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে।
ঢাকায় ইমিগ্রেশন সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরেছে ২০০৮ সালে ৩৮ হাজার ২৮৩ জন, ২০০৯ সালে ২৭ হাজার ৩০৪ জন, ২০১০ সালে ১৪ হাজার ১০৭ জন, ২০১১ সালে ১৬ হাজার ১৭ জন, ২০১২ সালে ৭০ হাজার ৬৪৬ জন, ২০১৩ সালে ১৫ হাজার ১২৮ জন, ২০১৪ সালে ১৫ হাজার ৭৭১ জন, ২০১৫ সালে ১৩ হাজার ৬৮০ জন, ২০১৬ সালে ৯ হাজার ৯জন, ২০১৭ সালে ১৬ হাজার ৩৭৪ জন এবং ২০১৮ সালে ২২৪ হাজার ২৭২ জন।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (মিনিস্ট্রি অব ইন্টেরিয়র) দেওয়া তথ্য মতে, এ বছরের ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৬৯ জন বিদেশি কর্মীকে আকামা, শ্রম ও বর্ডার আইন ভঙ্গ করায় আটক করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই ইয়েমেন ও ইথিওপিয়ার নাগরিক। ২০১৫ সালে সৌদি সরকার ১ হাজার ৬৮৩জন, ২০১৬ সালে ৩ হাজার ১৫৬ জন, ২০১৭ সালে ৪ হাজার ১৮৩, ২০১৮ সালে ১১ হাজার ৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। তবে,২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৩ হাজার ৩০১ জন বাংলাদেশি কর্মী দেশে ফেরত এসেছেন বলে দূতাবাসের পাঠানো এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।
সৌদি সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে এবছরের ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক লাখ ৫ হাজার ৮৯৯ জন বাংলাদেশি কর্মী তাদের কর্মস্থল থেকে পালিয়ে অবৈধ হয়েছেন। সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফেরত পাঠানো কর্মীদের বেশিরভাগই তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’র সৌদি আরবে গিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। দূতাবাস যাচাই করে দেখেছে— এসব ‘ফ্রি ভিসার’ শতকরা ১০০ ভাগই দূতাবাসের সত্যায়িত না। অভিযোগ আছে— কিছু বাংলাদেশি অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি দূতাবাসের সত্যায়ন ছাড়াই ঢাকা থেকে সত্যায়ন করে ‘ফ্রি ভিসা’র মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কাজ ছাড়াই সৌদি আরবে কর্মী পাঠায়। এরপর কাজ না পেয়ে অবৈধ কাজে লিপ্ত হন ওই কর্মীরা।
গত নভেম্বর মাসে সৌদি আরবে এ ধরনের কর্মীদের বিষয়ে জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ভিসা বাণিজ্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভিসা বাণিজ্য বন্ধ করতে আমাদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেবো। পাশাপাশি বৈঠকে সৌদি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে, তাদের ওখানেও কিছু ব্যক্তি ভিসা ট্রেডিংয়ের সঙ্গে জড়িত আছে। তারাও তাদের পক্ষ থেকে ভিসা ট্রেডিং বন্ধে পদক্ষেপ নেবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছে।’
ভিসা বাণিজ্যের কারণে নিঃস্ব হচ্ছেন অভিবাসী কর্মীরা
ভিসা বাণিজ্য নিঃস্ব করছে অভিবাসী কর্মীদের বলে মত দিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া, অভিবাসন ব্যয় বাড়ার ক্ষেত্রেও ভিসা বাণিজ্য দায়ী বলে মনে করেন তারা। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের আইনে ভিসা কেনাবেচা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশিরা যখন যেই বাজারে একটু বেশি যাওয়া আসা করে, ওই বাজারেই ভিসা কেনাবেচার ব্যবসা শুরু হয়। ভিসা বাণিজ্যের প্রভাব ওইসব শ্রমবাজারে পড়েছে। এ কারণে অভিবাসন খরচ একদম হুড়মুড় করে বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসন খরচবেশি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে এই ভিসা বাণিজ্য। এর সঙ্গে মূলত জড়িত সেদেশে যারা থাকেন। সেদেশে দূতাবাসের কর্মকর্তাসহ সবাই এক হয়ে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কারণে অন্যরা চাইলেও অভিবাসন খরচ কমাতে পারে না।’
শরিফুল হাসান আরও বলেন, ‘বিদেশ যেতে যে অতিরিক্ত টাকা লাগে সেই টাকার দায় কিন্তু শেষমেশ কর্মীর কাঁধেই এসে পড়ে। ফলে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বিদেশ যেতে হয়। আয় করেও সেই টাকা তোলা যায় না। যে কারণে অনেকেই আবার অন্য পেশায় নিযুক্ত হন এবং অবৈধ হয়ে যান। ২০১২-১৩ সালে সাত লাখ বাংলাদেশি লোক অবৈধ হয়ে গেলো। এর বড় কারণই হলো দিনের পর দিন ধরে চলে আসা ভিসা বাণিজ্য। আমরা অনেকবার সরকারের পক্ষ থেকে শুনেছি— ভিসা বাণিজ্য বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু কার্যত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যারা অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন, শুধু তারাই ভিসা বাণিজ্যের শিকার না, সাধারণ মানুষ যারা অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বিদেশ যাচ্ছেন, তারাও কিন্তু এর শিকার। আমি মনে করি, ভিসা বাণিজ্য বন্ধ করলে অভিবাসন ব্যয় কমে আসবে।’
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রা’র মহাসচিব শামিম আহমেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভিসা বাণিজ্য বাংলাদেশে হয় না। ভিসা বাণিজ্য হয় যেদেশ ভিসা ইস্যু করে সেই দেশে। তো সেখানে বাণিজ্য হলে বাংলাদেশে বসে বন্ধ করা যাবে কীভাবে? এটা বন্ধ করা খুবই সহজ, একটি সিস্টেম তৈরি করতে হবে। কর্মী সরবরাহ করবে সরকার, অর্থও দেবে সরকার। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কেবল ভিসা প্রসেস করবে। এটা করতে পারলে সব ধরনের ‘ভিসা ট্রেডিং’ বন্ধ হয়ে যাবে।’
বায়রা’র মহাসচিব আরও বলেন, ‘এজন্য একটি ডাটাবেজ করতে হবে। সেখানে পর্যাপ্ত কর্মী থাকতে হবে। অনলাইন সিস্টেমে আমি (সরকার) লোক নির্বাচন করবো, তার জন্য প্রযোজ্য চার্জ রিক্রুটিং এজেন্সির অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেওয়া হবে। এটা হলে কেউ আর ভিসা বাণিজ্য করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, যে দেশে কর্মীরা যায় সেদেশের নিয়োগকর্তাদেরও তাদের সরকারের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ভিসা ইস্যু করার আগে যেন সেটা ভেরিফাই করা হয় যে, সেই নিয়োগকর্তার আদৌ কোনও লোকের প্রয়োজন আছে কিনা। যার সত্যিই লোক লাগবে সেখানে আর ভিসা বাণিজ্য হবে না।’