মূল শিল্পীর স্বীকৃতি নেই, গ্রন্থনা-নির্দেশনায় লিয়াকত আলী লাকীর নাম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অংশের দায়িত্বে ছিল শিল্পকলা একাডেমি। প্রখ্যাত ও সুপরিচিত গান ও কবিতার সঙ্গে পরিবেশিত হয় নাচ। একটি বাদে আর কোনোটিতেই গীতিকার ও সুরকারের নাম উল্লেখ না থাকায় সমালোচনার মুখে পড়েছে একাডেমি। এমনকি শিশুদের দিয়ে অনেক বিখ্যাত গানের সমন্বিত পরিবেশনার ক্ষেত্রেও কোনও গীতিকবি ও সুরকারের নাম উল্লেখ না থাকলেও গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় লিয়াকত আলী লাকীর নাম কেন উল্লেখ করা হলো তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কপিরাইট অফিস বলছে, শিল্পকলা একাডেমি কপিরাইট আইনের তোয়াক্কা করে না। আমরা যেখানে ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টির অধিকারী যারা, তাদের সুরক্ষা দিতে চেষ্টা করছি, সেখানে একই মন্ত্রণালয়ের আরেকটি অফিস সেটি মানছে না।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে আলোচনা সভা হয়। দ্বিতীয় অংশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যার সার্বিক দায়িত্বে ছিল শিল্পকলা একাডেমি। অনুষ্ঠানের এই অংশের শুরুতে বলা হয়—কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের গানসহ প্রখ্যাত শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি থাকছে গীতিকার জুলফিকার রাসেলের লেখায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিশ্বখ্যাত অস্কারজয়ী ভারতীয় সুরকার ও সংগীতশিল্পী এ আর রহমানের গাওয়া বাংলা গান। এরপর শুরু হয়, ‘বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে তোমার স্বাধীন বাংলায় আজ’ গানটি দিয়ে।  একে একে পরিবেশন করা হয়—বিপুল তরঙ্গ রে তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা/এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা/ ভেবো না গো মা তোমার ছেলেরা হারিয়ে গিয়েছে পথে/ স্বাধীনতা তুমি কবিতা/ জয় সত্যের জয়/ আমরা সবাই বাঙালি। এসব গানের সঙ্গে নৃত্য পরিচালনা করা হয়। এরমধ্যে কেবল সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া প্রথম গানটিতে গীতিকার সুরকার, মূল শিল্পীর নাম উল্লেখ করা হয়।

.বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট  জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘মূল স্বত্বাধিকারী গীতিকার ও সুরকারের নাম অবশ্যই উচ্চারণ করতে হবে, প্রদর্শন করতে হবে, দৃশ্যমান হতে হবে। তা না হলে কার লেখা, কার সুরারোপিত, দর্শকের কাছে তা যায় না এবং কপিরাইট অধিকার লঙ্ঘিত হয়। যেকোনও পাবলিকের কাছে যখন এটা প্রচার করবো, অবশ্যই গীতিকার ও সুরকারের নাম দিতে হবে। তা না হলে তার ম্যোরাল রাইট ক্ষুণ্ন হয় বলে তিনি (গীতিকার ও সুরকার) অভিযোগ করতে পারেন।’

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বড় প্রতিষ্ঠান শিল্পকলা একাডেমি এই কপিরাইট আইনের তোয়াক্কা করে না। এটা আমাদের জন্য সাংঘাতিক কষ্টের। আমরা যেখানে ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টির অধিকারী যারা, তাদের সুরক্ষা দিতে চেষ্টা করছি, সেখানে একই মন্ত্রণালয়ের আরেকটি অফিস সেটি মানছে না।’

যদিও ‘সংগীত ঐক্য বাংলাদেশ’-এর মহাসচিব কুমার বিশ্বজিৎ মনে করেন, এর দায়ভার সংশ্লিষ্ট সবাইকেই নিতে হবে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আমি বলবো, যিনি পরিচালনা করেছেন, তার এবং বিটিভির দায়িত্ব ছিল। যারা সংশ্লিষ্ট তাদের সবাইকে দায়ভার নিতেই হবে। অবশ্যই গীতিকবি, সুরকার বা শিল্পীর নাম দেওয়া উচিত ছিল। এখানে নামটা দেওয়াতে অন্তত কৃপণতা দেখানো ঠিক হয়নি। এই সময়ে এসে অন্তত এমন ভুল করাও ঠিক নয়।’ তিনি বলেন, ‘যারা পরিশ্রম করেছেন, তাদের তো একটা প্রাপ্যতা আছে। সেখানে শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যের কথা যদি নাও বলি, নামটা দিয়ে তাদের সেই সম্মান দেখানো উচিত ছিল।’

বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক সোহরাব হোসেনের কাছে বিষয়টি কপিরাইট লঙ্ঘন ও অশোভন কিনা, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘সব গানে তো নেই। ওই অংশটা উনি (লিয়াকত আলী লাকী) গ্রন্থনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন বলে হয়তো তার নাম দেওয়া।’

মূল গানের গীতিকার ও সুরকারের নাম কোথাও না কোথাও উল্লেখ করা যেতো কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটার দায়িত্বে ছিল শিল্পকলা একাডেমি, আমি দেখবো।’