ব্র্যাকের ৫০ বছর

স্যার আবেদের দেখানো পথে চলতে চায় ব্র্যাক

ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্যার ফজলে হাসানের আবেদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল দেশ স্বাধীনের পর পর। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ফজলে হাসান আবেদ সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এ সময় তিনি তার লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রি করে শুরু করেন ত্রাণকাজ। মুক্তিযুদ্ধকালে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল শাল্লা এলাকায় কাজ শুরু করেন। এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায়ই তিনি ব্র্যাক গড়ে তোলেন। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে তার দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা ঘটে। দরিদ্র মানুষ যাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যে তিনি কর্মসূচি পরিচালনা করেন। তারই দেখানো পথ ধরে ব্র্যাককে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে যান বর্তমান কর্ণধাররা।

ব্র্যাকের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোমবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন, ব্র্যাকের বর্তমান চেয়ারপারসন ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের সুপারভাইজরি বোর্ডের চেয়ার আইরিন খান, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক শামেরান আবেদ, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের পরিচালক তামারা হাসান আবেদ, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।

মতবিনিময় সভায় ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আবেদ ভাই সাহসী এবং পরিশ্রমী ছিলেন। এমনি এমনি ব্র্যাক হয়নি। ব্র্যাকে এই মুহূর্তে যা যা কর্মসূচি আছে সেগুলো একটি স্তর। এখন স্বপ্নগুলো উন্মচিত হচ্ছে। আবেদ ভাইয়ের মূল একটা বার্তা ছিল যে, ক্ষমতায়নের বিষয়। আমাদের আর্থিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ক্ষমতায়ন খুবই জরুরি।

তিনি আরও বলেন, ৫০ বছরের মাইলফলকে দাঁড়িয়ে জ্ঞানভিত্তিক ক্ষমতায়নের প্রয়োজন আছে। কারণ বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের অসমতা আছে। জ্ঞানের অসমতা এর মধ্যে অন্যতম। গ্লোবাল সাউথ নামে একটি পরিচয় নিয়ে স্বল্প পরিসরে নতুন প্ল্যাটফর্মের জায়গায় ব্র্যাক একটি উদ্যোগী ভূমিকা আশা করি রাখবে। সেভাবে এই স্বপ্ন ও নিয়তের যাত্রা অব্যাহত থাকবে নতুন মহিমা ও সমৃদ্ধিতে।

আইরিন খান বলেন, করোনার আগে যত অর্জন ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণে— তা করোনা আসার পর ভেস্তে গেছে। তাছাড়া বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে খাদ্যের দাম সামনে আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে বিশ্বের ৩০ শতাংশ গম আহরণ করা হয়। ইউক্রেন বলেছে –এই বছর গম চাষ করতে পারবে না। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এই তিন সমস্যার সম্মুখীন হতে ব্র্যাক কিন্তু এক মুহূর্ত দ্বিধা করছে না। কারণ ব্র্যাকের জন্ম হয়েছিল সমস্যার সমাধান করতে। যুদ্ধ পরবর্তী দেশের কী অবস্থা ছিল জানি। এখন যখন দক্ষিণ সুদানে যাই তখন আমার চোখের সামনে সেই চিত্র ভেসে ওঠে। এই ৫০ বছরে বাংলাদেশ কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছে! সেই যাত্রায় ব্র্যাকের অনেক অবদান!

শামেরান আবেদ বলেন, ব্র্যাক এখন ৯টি দেশে কাজ করছে। ২০০২ সালে ব্র্যাক যখন দেশের বাইরে পা রাখে তখন আমাদের প্রধান চিন্তা ছিল যে তার আগের ৩০ বছর ব্র্যাক বাংলাদেশে যে কর্মসূচি চালিয়েছে, তার অভিজ্ঞতা অন্য দেশে কাজে লাগানো।

তামারা হাসান আবেদ বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই— মানুষের সমস্যার সমধান করা। দেশের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে আমরা একটার পর একটা উদ্যোগ নিয়েছি। আড়ং চাইলে ঢাকার আশপাশ থেকে আরও কম খরচে পণ্য নিতে পারতো। তাতে সরবরাহ খরচ কমতো। কিন্তু আড়ংয়ের উৎপাদন কেন্দ্র বেশিরভাগই দূর দুরান্ত এলাকায়। যার অন্যতম কারণ দরিদ্র নারী শিল্পীদের কর্মসংস্থান।

তিনি আরও বলেন, আজ আড়ংয়ের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রায় ৬৫ হাজারেরও বেশি কারুশিল্পী। আমরা আড়ংয়ের পণ্যের মাধ্যমে সবসময় বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরেছি। শুধু দেশে নয় গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলার কারুশিল্প।

আসিফ সালেহ বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই কোনও না কোনও ব্র্যাকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নে তাকে কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করার একটি সামাজিক বিপ্লব শুরু হয়েছে। সেই মন্ত্র নিয়ে ব্র্যাক আগামী দিনগুলোতে কাজ করে যাবে।

তিনি আরও বলেন, ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাতা উত্তরসূরীদের জন্য এক অনন্য বার্তা রেখে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নারী দারিদ্র্যের ব্যবস্থাপক’। তিনি বিশ্বাস করতেন নারীদের সব করার সক্ষমতা রয়েছে। নারীকে দুর্বল শক্তিহীন হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা, তাকে আমূল পাল্টে দেওয়া জরুরি। নারীকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়েই কেবল তা সম্ভব হবে। এজন্য ব্র্যাকের সকল কর্মসূচি, কার্যক্রম ও মডেল, সর্বোপরি ব্র্যাক ব্র্যান্ডটিই গড়ে উঠেছে নারীর ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে।