সড়ক দুর্ঘটনা এবং হতাহত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ‘বড় বিপদ’ হিসেবে দেখা দিয়েছে মোটরসাইকেল। দ্রুতগতির এই বাহনটি ‘সড়কের আপদ’ হয়ে দেখা দিয়েছে। বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গত তিন বছর ৯ মাসে বাইক দুর্ঘটনার চিত্রের দিকে তাকালেই আতঙ্কের এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংগঠনটি বলছে, এ সময়ে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৯ হাজার ২৩টি, প্রাণহানি ঘটেছে ২১ হাজার ৯৮৩ জনের। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪৭৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৩৩ জন নিহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৬৪৮টি, প্রাণহানি হয়েছে ৪ হাজার ৬২২ জনের। এ ছাড়া চলতি বছরের ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ১ হাজার ৮৩১টি বাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৯১১ জনের।
বাইকের এসব দুর্ঘটনার পেছনে অভিভাবকদের অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সন্তানদের আবদারে তাদের হাতে বাইক তুলে দিচ্ছে ধনী ও মধ্যবৃত্ত পরিবারগুলো। এই বাইক নিয়ে তারা সড়কে উঠলেই বেপরোয়া গতিতে ছুটছে। ট্রাফিক আইন জানে না, জানলেও মানছে না অনেক যুবক। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে, প্রাণ যাচ্ছে তাদের।’
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বছরভিত্তিক হিসাব বলছে, ২০১৯ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে ১ হাজার ১৮৯টি, নিহত হন ৯৪৫ জন। ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা ১ হাজার ৩৮১টি, নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৬৩ জন। ২০২১ সালে বাইক দুর্ঘটনা ঘটে ২ হাজার ৭৮টি, প্রাণহানি হয়েছে ২ হাজার ২১৪ জনের। গত তিন বছরের ব্যবধানে (২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল) বাইক দুর্ঘটনা ১ হাজার ১৮৯টি থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ২ হাজার ৭৮টিতে পৌঁছেছে। মৃত্যুর সংখ্যাও ৯৪৫ জন থেকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২ হাজার ২১৪ জনে ঠেকেছে।
বাইকে অগণিত মৃত্যুর রাশ টেনে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, জীবন শুরু করার আগেই ঝরে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় স্বপ্নগুলো। এটি পরিবার ও দেশের জন্য মর্মান্তিক। এই প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হলে যুবকদের হাতে বাইক তুলে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে।
চলতি বছরের ৯ মাসে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের দেওয়া মাসভিত্তিক হিসাবে— এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাইক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮৭টি, নিহত ২১৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে দুর্ঘটনা ১৭১টি, নিহত ১৯৩ জন, মার্চে দুর্ঘটনা ১৮২টি, নিহত ২২১ জন, এপ্রিলে দুর্ঘটনা ১৮৯টি, নিহত ২০৬ জন, মে মাসে দুর্ঘটনা ২৪৭টি, নিহত ২৭৯ জন, জুনে দুর্ঘটনা ১৯২টি, নিহত ২০৪ জন, জুলাইয়ে দুর্ঘটনা ২৯৮টি, নিহত ২৫১ জন, আগস্ট মাসে দুর্ঘটনা ১৮৩টি, নিহত ১৭১ জন এবং সেপ্টেম্বরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮২টি, নিহত হয়েছেন ১৬৯ জন।
বাইকের এসব দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় টগবগে যুবকরা প্রাণ দিচ্ছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের প্রভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে বেপরোয়া গতিতে ছুটছে যুবকরা। বাইক কোম্পানিগুলোও তাদের বিজ্ঞাপনে গতির প্রতিযোগিতা সামনে আনছে।’
সিদ্দিকুর রহমানের অভিযোগ, সড়ক নিরাপত্তা আইনের বাস্তবায়নেও প্রশাসনের গাফিলতি আছে। তার মন্তব্য, ‘সব মিলিয়ে গতির সঙ্গে ছুটে চলা তেজি যুবকরা অসময়ে সড়কে নির্মমভাবে প্রাণ হারাচ্ছে। এতে দেশের বড় ক্ষতি হচ্ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, কেবল সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে মোটরসাইকেলের ১৮২টি দুর্ঘটনায় চালক ও আরোহী মিলিয়ে নিহত হয়েছে ১৬৯ জন। তার আগের মাস আগস্টে ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৭২ জন প্রাণ হারান।
‘এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন’ বলে মনে করেন সিদ্দিকুর রহমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘বাইক কোম্পানিগুলোকে বেপরোয়া গতিরোধের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করা উচিত। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরকেও এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।