সাক্ষাৎকারে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি

‘শাজাহান খান-ওসমান আলী চালকদের নিয়োগপত্র দেননি কেন?’

দেশের অধিকাংশ সড়কই দ্রুতগতির যান চলাচলের জন্য নিরাপদ নয় বলে মনে করেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও দক্ষিণবঙ্গ বাস মালিক সমিতির সভাপতি আজমল উদ্দিন আহমেদ সবুর। তবে তিনি স্বীকার করেন, দেশে দক্ষ চালকের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে চালকদের নিয়োগপত্র দেওয়ায় সব পক্ষেরই অনীহা দায়ী উল্লেখ করে তিনি বলছেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারাও এটা চান না। পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে চালকদের ডোপটেস্ট বাধ্যতামূলক করা দরকার বলেও জোর দেন তিনি।

‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ উপলক্ষে মালিকদের সড়ক নিরাপত্তায় ভূমিকা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে এসব মতামত ব্যক্ত করেন আজমল উদ্দিন আহমেদ সবুর। এসময় তিনি সড়কে অরাজকতা, সরকারের দায়িত্বসহ নানা বিষয়েও কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের নিজস্ব প্রতিবেদক রাশেদুল হাসানের সঙ্গে।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১৮ সালের বড় আন্দোলনের পরও সড়ক নিরাপদ হলো না কেন?

আজমল উদ্দিন: মুখে নিরাপদ সড়কের কথা বললেই সড়ক নিরাপদ হয়ে যাবে না। আমার গাড়ি আছে। আমিও তো বাসে চড়ি, তাই না? আমি কি নিরাপদ সড়ক চাই না? এ আন্দোলনে মালিক, শ্রমিক, পুলিশ, যাত্রী ও পথচারী সবাইকে শামিল হতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে সড়কে দুর্ঘটনার কারণ কী বলে মনে করেন?

আজমল উদ্দিন: প্রথমত আমাদের রাস্তার বেশিরভাগ মোড় দ্রুতগতির যানের জন্য নিরাপদ নয়। তাছাড়া আমাদের দক্ষ বাস চালকের সংকট আছে। দক্ষ চালক তৈরি করার জন্য আমাদের সাধারণ সম্পাদক এনায়েত সাহেব (খন্দকার এনায়েত উল্লাহ) নিজে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি তার প্রস্তাবে একটা জায়গা ভাড়া চেয়েছিলেন, যেখানে আমরা একটা মোটরযান ড্রাইভিং স্কুল করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা পাইনি। সড়ক নিরাপদ করার জন্য বিআরটিএ'র মাধ্যমে চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটি কী কারণে বন্ধ হলো আমরা জানি না।

দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, চালক দক্ষ নন কিংবা যিনি বাস চালাচ্ছিলেন তিনি আসলে চালকই নন। হয় চালকের সহকারী, নয়তো স্বশিক্ষিত চালক। চালকদের সঙ্গে যারা থাকেন (সহকারী), মাঝে মধ্যে গাড়ি ডিপোতে রাখার জন্য তার কাছে দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ ছাড়া এটুকুতেই তারা চালক হয়ে যান। আমার মনে হয় না অর্ধেক চালকও রোড সাইন ফলো করে গাড়ি চালান। তারা মূলত সামনের গাড়ি কীভাবে চলে, সেটা অনুসরণ করেন।

বাংলা ট্রিবিউন: চালকদের নিয়োগপত্র ও বেতন নির্ধারণ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও নির্দেশনা আছে, করছেন না কেন?

আজমল উদ্দিন: আমরা চালকদের নিয়োগপত্র ও বেতন দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এটা কীভাবে করবেন। আজ একজন চালক একটি গাড়ি চালায়, সেই গাড়িতে একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কালকে আরেকটা চালায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান ও সাধারণ সম্পাদক ওসমান ভাইয়ের (ওসমান আলী) সামনেই অফার করা হইছে। তাদেরও তো গাড়ি আছে। তারা তাদের গাড়ির চালকদের নিয়োগপত্র ও বেতন দেন না কেন? আসলে তারাও এটা চান না।

বাংলা ট্রিবিউন: শ্রমিকরা তো আপনাদের নিয়ন্ত্রণেই কাজ করে। এক্ষেত্রে মালিকদের কোনও গাফিলতি আছে?

আজমল উদ্দিন: মালিকদের দায়িত্ব গাড়ির যাবতীয় কাগজপত্র ঠিক রাখা। কাগজপত্র ঠিক না থাকলে চালকরা জরিমানার ভয়ে অনেক সময় পুলিশকে এড়াতে জোরে গাড়ি চালায়। আর চালক-শ্রমিকরা মালিকদের পাত্তাই দেয় না। আমরা এক চালক বাদ দিয়ে আরেকজনকে যে উঠাবো, চালকই তো নেই। অদক্ষ চালকই সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটলে পুলিশ, বিআরটিএ সব দৌড়ঝাঁপ শুরু করে, তারপর আর খবর থাকে না। আপনি ফুলবাড়িয়া-সায়দাবাদে যান, একজন চালক না থাকলে গাড়ি বসিয়ে রাখা হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১৮ সালে নতুন করে কঠোর সড়ক আইন করা হলো। তারপরও সড়ক নিরাপদ নয় কেন?

আজমল উদ্দিন আহমেদ সবুর

আজমল উদ্দিন: আইন থাকলে তো হবে না, মানাতে হবে। পয়সা নিয়ে ছেড়ে দিলে তো হবে না। কিছু মানুষ আছে আইন-কানুন মানতে চান না। অনেকে গাড়ি চালান, পুলিশ সিগন্যাল দিলে বলে আমি অমুক। সবার ক্ষেত্রে আইন সমান হতে হবে। টাকা দিলে ছাড়া পাবো—এই ধারণা চলতে থাকলে আইনও মানবে না, সড়কও নিরাপদ হবে না।

বাংলা ট্রিবিউন: সড়কে যে রেষারেষির ঘটনা ঘটে, এরমধ্যে দেখা যায় একই কোম্পানির বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা হচ্ছে। এটা কেন হয়, এটা কি বন্ধ হবে না?

আজমল উদ্দিন: এটা বন্ধ হবে তখন, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক যে কায়দায় বাসের কোম্পানি করতে চেয়েছিলেন, সেটা অনুসরণ করলে। তিনি পরিবহনকে সুন্দর একটি জায়গায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সব পুরনো গাড়ি পরিবর্তন করে নতুন গাড়ি নামানো। এটা করতে খুব বেশি টাকার দরকার হয় না। এটার জন্য চার শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ারও প্রস্তাব ছিল। সব গাড়ি এক কোম্পানির আওতায় থাকতো। অংশ অনুযায়ী ভাগ পেতো, কোনও প্রতিযোগিতা হতো না। এখন চলে গেট পাস সিস্টেমে। এমনও কোম্পানির মালিক আছেন, যার গাড়িই নাই। জয়েন্ট স্টকে কোম্পানি খুলে রুট পারমিট নিয়ে ব্যবসা করেন। অন্য মালিকদের গাড়ি তার কোম্পানি ও রুটে ঢোকায়। একই কোম্পানির বাস চললেও মালিক ভিন্ন। চালক ও মালিকদের লাভের হিসাব আলাদা। বাস বেশিরভাগ যানজটে পড়ে থাকে, তাই ট্রিপ কম হয়। চালকরা বেশি ট্রিপ দেওয়া ও তাদের টাকা ওঠানোর জন্য এটা করে।

বাংলা ট্রিবিউন: নগরে বাসের শৃঙ্খলা আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটি হয়েছে। তারা কি এই কাজটা করতে পারবে?

আজমল উদ্দিন: বর্তমান কমিটি দুটি রুটে মডেল হিসেবে বাস চালু করে। সবই ঠিক ছিল। আমরা বললাম, মডেল হিসেবে বাস আপনি কতদিন চালাবেন। সারা বছর তো চালাতে পারবেন না। একটা সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকবে। মেয়র সাহেবরা যা করছেন, আমার মনে হয় না এটা সফল করতে পারবেন। কারণ, এর পেছনে অনেক পরিশ্রম দরকার। পরিবহনের দক্ষ লোকদের এখানে কাজে লাগানো দরকার। তবে আমরা সমর্থন করি এবং চাই এটা হোক।

বাংলা ট্রিবিউন: গাড়ির গতি দুর্ঘটনার জন্য কতটুকু দায়ী?

আজমল উদ্দিন: একটা জিনিস লক্ষ করবেন, যেই বাসের মালিক নিজেই চালক, সেই বাসে দুর্ঘটনা কম হয়। হাইওয়েতে গাড়িকে ওভারেটেক করা দুর্ঘটনার বড় কারণ। অনেক চালক সামনের আড়ালের গাড়িগুলো ভালোভাবে না দেখেই টান দেয়। আবার অনেকে গতির সাথে মেলাতে না পারে দুর্ঘটনার শিকার হয়। ওভারটেক করতে হয়, কিন্তু এটার জন্য দূরত্ব ভালোভাবে খেয়াল করে সামনে পেছনের গাড়িগুলো খেয়াল করতে হয়। দুর্ঘটনা সবসময় চালকের দোষেও হয় না। আপনি ভালোভাবে ওভারটেক করছেন, কিন্তু পেছনে আরেকজন অদক্ষ চালক এসে ধাক্কা দিলো। বাসের গতিরোধ করার জন্য অনেক মালিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও বাসের স্পিড সিলড করে দেন। তাও চালকরা অমান্য করে ভেঙে ফেলে। আমাদের কিছু মালিক এখন এই প্রযুক্তি আনছেন, তারা এখন অফিসে বসে দেখতে পারেন কোন গাড়ি কত গতিতে চলছে। এটা মনিটরিংয়ের জন্য আবার আলাদা লোকও লাগে। তবে ভালো ফল পাওয়া যায়।

বাংলা ট্রিবিউন: সড়কে অনেক ফিটনেসবিহীন গাড়ি দেখা যায়। দুর্ঘটনার জন্য এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ি কতটুকু দায়ী?

আজমল উদ্দিন: অনেকে বলেন ফিটনেসবিহীন গাড়ি দুর্ঘটনার বড় কারণ। এটা আমরা অবমূল্যায়ন করি। ফিটনেস সনদ এক বছরের জন্য দেওয়া হয়। এজন্য অনেক গাড়ির সনদ হালনাগাদ থাকে না। আমি নতুন একটা গাড়ি নামালাম, ফিটনেস সনদ ছাড়া এটা চলাচলের জন্য আনফিট হবে?

বাংলা ট্রিবিউন: এক্ষেত্রে বিআরটিএ'র দায় কতটুকু দেখছেন আপনি।

আজমল উদ্দিন: বিআরটিএ'র গাফিলতি একটাই, যে গাড়ি আনফিট সেটাকে ফিটনেস সনদ দেওয়া। এমন গাড়িও আছে, যেটাকে ফিটনেস সনদ দেওয়া যায় না। সেটাকেও যদি দিয়ে দেয়, এ কারণেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বাংলা ট্রিবিউন: চালকদের ডোপটেস্ট কি হয়?  

আজমল উদ্দিন: মাদকেরও একটা ব্যাপার আছে। অনেকে মাদক নিয়েও গাড়ি চালায়। বিশেষ করে রাতে যারা চালায়। সরকার থেকে বলা হয়েছিল চালকদের ডোপ টেস্ট হবে। কবে হবে, কীভাবে হবে জানি না, এখনও হচ্ছে না। এই টেস্ট বাধ্যতামূলক করা উচিত, যেভাবে চালকের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: নসিমন, করিমন মহাসড়কে দুর্ঘটনার কতটুকু দায়ী?

আজমল উদ্দিন: নসিমন, করিমনসহ স্বল্পগতির যানবাহন আমরা বন্ধ করতে বলেছিলাম। এখন অনেক এলাকার সংসদ সদস্যরা দাবি তুলছেন। কিন্তু দিনে দিনে এই গাড়ির সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে এই গাড়ির কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। ছোট ছোট রাস্তায় এগুলো চলতে পারে, কিন্তু মহাসড়কে এগুলো বিপজ্জনক।