বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎকারী ৪ প্রতারক গ্রেফতার

ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎকারী প্রতারক চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগ। শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) মোহাম্মদপুর ও কলাবাগান এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

রবিবার (৩০ অক্টোবর) বিকারে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ এ তথ্য জানান। এ লক্ষ্যে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলো— হায়দার আলী (৬৪), রেজাউল করিম (৩৭), নাসির উদ্দিন (৪৯) ও আব্দুল কাদের (৫৬)। এসময় তাদের কাছ থেকে নগদ ২০ লাখ ৩ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

চলচি মাসের ৯ অক্টোবর  অবসরপ্রাপ্ত একজন  অতিরিক্ত সচিবকে প্রতারক চক্রের এক সদস্য ফোন করে নিজেকে বাংলাদেশ নেদারল্যান্ড রিসাইক্লিং পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পের কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দেয়। কথাবার্তার এক পর্যায়ে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবকে তাদের প্রজেক্টে কনসালটেন্ট পদে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

পরে ১০ অক্টোবর প্রতারকদের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী, মিরপুর মডেল থানার মধ্য পীরেরবাগে অবস্থিত একটি অফিসে যান এই ভুক্তভোগী।

সেখানে ভিকটিমের সঙ্গে গ্রেফতারকৃত হায়দার আলীর পরিচয় হওয়ার পর কনসালটেন্ট পদে নিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনা হয়। পরবর্তী সময়ে গত ১৭ অক্টোবর তিনি বায়োডাটা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ওই অফিসে উপস্থিত হলে প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার দেখা হয়। এ সময়ে প্রতারক চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ব্যবসা সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা শুরু করে।

চক্রের এক সদস্য নিজেকে ইমপোর্টারের ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দেয়। সে চত্রের অন্য সদস্যদের জানায়, তার একজন ভারতীয় বস ১৬ কোটি টাকার চশমা, হাতঘড়ি, ক্যামেরা ক্রয় করবে। ওই চশমা, হাতঘড়ি, ক্যামেরা ইমপোর্ট করে ভারতীয় বসকে সরবরাহ করলে ৩০ শতাংশ লাভ হবে।

ওই পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে ভারতীয় বসকে দেখাতে হবে, যার জন্য ৭৫ লাখ টাকা লাগবে। প্রতারক চক্রের সদস্যরা তখন ওই অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবকে ব্যবসায় শেয়ারে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। ভুক্তভোগী প্রথমে রাজি না হলেও প্রতারকদের প্রলোভনের কারণে ওই ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহী হন। পরে গত ১৯ অক্টোবর তিনি প্রতারকদের কথা মতো ৫ লাখ টাকা দেন। পরে প্রতারক চক্রের সদস্যরা জানায়, নমুনা সংগ্রহ করে ভারতীয় বসকে দেখানো হয়েছে এবং নমুনা তার পছন্দ করেছে।

গত ২০ অক্টোবর ভুক্তভোগী প্রতারকদের অফিসে যান এবং দেখতে পান— ভারতীয় বস তাদেরকে ৩০ শতাংশ অগ্রীম বাবদ ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। প্রতারকরা ভুক্তভোগীকে জানায়, তারা ইমপোর্টারকে ৩০ শতাংশ পরিশোধ না করলে মালামাল দেবেন না। উল্লিখিত মালামাল কেনার জন্য প্রতারকরা ভিকটিমকে আরও ৫০ লাখ টাকা দিতে বলেন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী তাদের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা গোয়েন্দাদের  জানায়, তারা একইভাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে প্রতারিত করে ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে। গ্রেফতারকৃতরা পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন যাবৎ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অফিস সাজিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজনের টাকা আত্মসাৎ করে থাকে। প্রতারকরা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী এবং বয়োবৃদ্ধ লোকদের টার্গেট করে প্রতারণা করে আসছে।

ডিবি প্রধান বলেন, ‘এই চক্রটি এর আগেও একবার গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। রাজধানীতে তাদের তিন-চারটি অফিস আছে। প্রতিটি অফিস থেকে তারা দুইটা থেকে তিনটা প্রতারণা করে অফিস ছেড়ে চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘চক্রটি প্রতারণার টাকায় নিজেদের সম্পদশালী করে তুলেছে। এই চক্রের মধ্যে একজনের সাভারে একটি এবং ঢাকায় দুটি বাড়ি রয়েছে এবং  চক্রের আরেক সদস্যের গাড়ির ব্যবসা আছে।’

ডিবি জানায়, এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি প্রতারণা মামলা করা হয়েছে। এছাড়া তাদের নামে রাজধানীসহ সারাদেশে আরও  ১০টি মামলা রয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা পুলিশ হেফাজতে আছে। তাদের চক্রের অন্যান্য পলাতক সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মানস কুমার পোদ্দার, উপকমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন, মিরপুর জোনাল টিমের টিম লিডার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সাইফুল ইসলাম ও সহকারী পুলিশ কমিশনার ইমরান হোসেন মোল্লা উপস্থিত ছিলেন।