‘তিন পাত্তি গোল্ড’ মূলত একটি অ্যাপ। এই অ্যাপ মোবাইল ফোনে ডাউনলোড করে খেলা যায়। অ্যাপের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মুনফ্রগ ল্যাবের কাছে। গেম খেলার জন্য রেজিস্ট্রেশনের পর একজন গ্রাহককে কিছু চিপস ফ্রি দেওয়া হয়। পরে খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থের বিনিময়ে চিপস কিনতে হয়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে চিপস কেনার অর্থের লেনদেন হচ্ছিল। প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার কোটি চিপস বিক্রি হতো। প্রতি কোটি চিপস বিভিন্ন পর্যায়ে ৪৬ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি করা হতো। ‘তিন পাত্তি গোল্ড’-এর প্রায় ৯ লাখ নিয়মিত গেইমার রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার চিপস বিক্রি হচ্ছিলো।
সোমবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর কাওরান বাজার মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। ‘তিন পাত্তি গোল্ড’সহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশের বাইরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে উল্কা গেমস লিমিটেডের সিইও জামিলুর রশিদসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয় রবিবার। এরপরই এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে র্যাব। রবিবার রাজধানীর মহাখালী ও উত্তরা এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন– উল্কা গেমস লিমিটেডের সিইও জামিলুর রশিদ (৩১), সায়মন হোসেন (২৯), মো. রিদোয়ান আহমেদ (২৯), মো. রাকিবুল আলম (২৯), মো. মুনতাকিম আহমেদ (৩৭) ও কায়েস উদ্দিন আহম্মেদ (৩২)। এ সময় উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, সিপিইউ, সার্ভার স্টেশন, হার্ড ডিস্ক, স্ক্যানার, ডিভিডি ড্রাইভ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ডেভিট ও ক্রেডিট কার্ড, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ টাকাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার আড়ালে দেশের বাইরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাঠানোর মূলহোতা ও উল্কা গেমসের সিইও জামিলুর রশিদসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গ্রেফতার জামিলুর রশিদ উল্কা গেমসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। ২০১৭ সালে ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান ‘মুনফ্রগ ল্যাবের’ সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ২০১৮ সালে সে মুনফ্রগ ল্যাবের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে দেড় লাখের বেশি টাকা বেতনে নিযুক্ত হন। মুনফ্রগ ল্যাবের অনলাইন জুয়া অ্যাপ ‘তিন পাত্তি গোল্ডের’ জনপ্রিয়তা বাড়ায় গেমটিকে আরও ছড়িয়ে দিতে চায় জামিলুর রশিদ। এ জন্য বাংলাদেশে বৈধতা প্রদানে কয়েকজন আইনজীবীর পরামর্শে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে ‘উল্কা গেমস লিমিটেড’ নামে একটি গেমিং ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেয়। ২০১৯ সালে মুনফ্রগের ০.০১ শতাংশ উল্কা গেমসকে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে গেমিং খাতে উন্নয়নে প্রায় দেড় কোটি টাকা দিয়ে চুক্তিবদ্ধ হয় তারা। দেশে গেম ডেভেলপমেন্টের অনুমোদন থাকলেও অনলাইন জুয়া/ক্যাসিনোর অনুমোদন না থাকায় উল্কা গেমস বিভিন্ন ভুল তথ্য উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে আইনি বৈধতা পাওয়ার ব্যবস্থা করে। এভাবেই ‘তিন পাত্তি গোল্ড’ যাত্রা শুরু করে শহর নগরে ছড়িয়ে পড়ে। উল্কা গেমসের যাত্রা গেমিং ডেভেলপমেন্টের উদ্দেশ্যে শুরু হলেও তারা বস্তুত গেম ডেভেলপমেন্ট না করে তিন পাত্তি গোল্ডসহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাঠিয়ে আসছিল।
কমান্ডার খন্দকার আল-মঈন বলেন, তিন পাত্তি গোল্ড একটি অ্যাপে তিন পাত্তি গোল্ড ছাড়াও ‘রাখি’, ‘আন্দর বাহার’ ও ‘পোকার’ নামেও অনলাইন জুয়ার গেমস রয়েছে। যেকোনও কাজের পাশাপাশি এই গেম খেলা যায় বলে তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয়তা পায়।
র্যাব জানায়, বিভিন্ন বট প্লেয়ার/রোবট প্লেয়ারের মাধ্যমে মূল গেইমারদের কৌশলে হারিয়ে প্লেয়ারদের পরে আরও চিপস কিনতে উৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশে তিন পাত্তি গোল্ডের চিপস বিক্রির কাজটি ১৪টি অফিসিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর বা এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। এসব ডিস্ট্রিবিউটরের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে। এছাড়াও প্রাইভেট টেবিল অপশনের মাধ্যমে অন্য প্লেয়ার থেকেও চিপস কেনা যায়। বর্তমানে তিন পাত্তি গোল্ডে প্রায় ৯ লাখ নিয়মিত গেইমার রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার চিপস বিক্রি হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে র্যাব জানায়, ভার্চুয়াল চিপস অর্থের বিনিময়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মূলত বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চিপস বিক্রির টাকা ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে উল্কা গেমসের চারটি অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটির বেশি টাকা রয়েছে। এছাড়াও গত দুই বছর তারা মুনফ্রগ ল্যাবকে ব্যাংকের মাধ্যমে ২৯ কোটি টাকা দিয়েছে। উল্কা গেমসের মোট ৩৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। বেতন দেওয়াসহ অফিস পরিচালনায় প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ হতো। এছাড়াও, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাৎসরিক বেতনের ৩০-৯০ শতাংশ হারে বোনাস দেওয়া হতো। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেশের বাইরে অনলাইন জুয়ার টাকা পাঠানো হতো।
কে এই জামিলুর রশিদ
জামিলুর রশিদ ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০১২ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই মোবাইল গেইমসের প্রতি আসক্ত হওয়ায় ২০১৫ সাল থেকে মোবাইল গেম তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। ‘হিরোজ অব ৭১’ ও ‘মুক্তি ক্যাম্প’ নামে ২০১৭ সালে দুটি গেম নির্মাণের জন্য সে সরকারের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা অনুদান পান। পরে ২০১৭ সালে মুনফ্রগ ল্যাবের সঙ্গে পরিচয় তার। ২০১৮ সালে তিনি গেম ডিজাইন কনসালটেন্ট ও বাংলাদেশে নিযুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে মুনফ্রগ থেকে দেড় লাখের বেশি টাকা বেতনে যুক্ত হন। ২০১৯ সালে উল্কা গেমস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সিইও হিসেবে নিযুক্ত হয়ে তিনি মুনফ্রগ থেকে মাসে প্রায় চার লাখ টাকা বেতন পেতেন। এছাড়াও বাৎসরিক আয়ের ৯০-১০০ শতাংশ বোনাস পেতেন তিনি। তার বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে বেশ কিছু টাকা, একটি দামি গাড়ি এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ফ্ল্যাট ও জমি রয়েছে।