জবির ক্যান্টিনের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ক্যান্টিনের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী ও ক্যান্টিনের পরিচালক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়ক কর্মচারী মো.শরীফুল ইসলাম মালিকানা নিজের দাবি করে ক্যাফেটেরিয়ার বর্তমান পরিচালক মো. মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ তুলেছেন। একইসঙ্গে মাসুদকে একাজে সহযোগিতা করার অভিযোগ করেছেন প্রক্টর অফিসের কর্মচারী মোস্তাক মোল্যার বিরুদ্ধে। এঘটনায় শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ারও দাবি করা হয়।

তবে শরীফুল ইসলামের অভিযোগকে অসত্য দাবি করে ও নিজেদের অবস্থান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে পৃথক চিঠি দিয়েছেন ক্যান্টিন পরিচালক মাসুদ ও প্রক্টর অফিসের কর্মচারী মোস্তাক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর দেওয়া অভিযোগপত্রে শরীফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, অনেক ধার দেনা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার পূর্বের মালিক আমজাদ হোসেনের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ক্যাফেটেরিয়াটি নেন তিনি। যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষী হিসেবে অর্থ ও হিসাব দফতরের সহায়ক কর্মচারী আনোয়ার হোসেন বিলামিনের নাম উল্লেখ করা হয়। পূর্বের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল বাকীর আমলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জামানত বাবদ এক লাখ টাকা দিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকায় তার নামে ক্যাফেটেরিয়া করা যাবে না বিধায় তখন ক্যাফেটেরিয়াতে বয়ের কাজ করা মো. মাসুদ আলমকে (বর্তমান ক্যাফেটেরিয়া পরিচালক) মালিকের আসনে বসান এবং তার নামে সবকিছু করেন। ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছে, তাই সে পুরো ক্যাফেটেরিয়ার মালিক বনে গেছে বলে দাবি করে মাসুদ। এরপর শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তিনি। ছাত্রলীগকে তিনি যে চাঁদা দিয়েছেন, তার সাক্ষী হিসেবে প্রক্টর অফিসের কর্মচারী মোস্তাকের নাম উল্লেখ করেন তিনি। মোস্তাক এখন মাসুদ আলমের পার্টনার বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। প্রশাসনে যে ট্রেড লাইসেন্সটি দেওয়া হয়েছে সেটি ডুপ্লিকেট লাইসেন্স বলে অভিযোগ করে মূল লাইসেন্স তার কাছে সংরক্ষিত আছে, এমন দাবি করেন শরিফুল ইসলাম।

তবে শরীফুল ইসলাম নিজের মালিকানার বিষয়ে দাবি করলেও সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯ এর  বিধি-১৭ তে বলা হয়েছে, কোনও সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্ব অনুমোদন ব্যতিরেকে সরকারি কার্য ব্যতীত অন্য কোনও ব্যবসায়ে জড়িত হতে পারবেন না।

শরীফ তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমার জীবনে আমি এ পর্যন্ত যত মানুষকে বিশ্বাস করেছি, সবার কাছ থেকে ধোকা পেয়েছি। তার মধ্যে মাসুদ একজন। যাকে আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যা্ন্টিনের বয় থেকে মালিকের আসনে বসিয়েছি, সেই আজ আমার সঙ্গে বেঈমানি করে এখন নিজেকে মালিক দাবি করছে। অথচ এই মাসুদকে আমি আমার নিজের ভাইয়ের মতো দেখেছি। আমার স্ত্রীকে ডাক্তার না দেখিয়ে তাকে ডাক্তার দেখিয়েছি। সেই জন্য আজ  আমি আমার আপনজনের কাছেও খারাপ। এই ক্যান্টিনের কারণে দেনায় ডুবে আজ  আমি দেশান্তরি হতে বাধ্য হয়েছি। এই দুনিয়াতে মনুষ্যত্ব নাই টাকাটাই দুনিয়ায় সব কিছু। টাকার কারণে আজ আমি পথের ফকির হয়ে গেছি। আজ  আমি আমার আপনজনের কাছ থেকে অনেক দূরে। তাদের কাছেও আমি খারাপ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে আমার একটায় অনুরোধ, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে মাসুদের সঠিক বিচার দাবি করছি।'

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীফুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরে কর্মরত ছিলেন। পরে তাকে আইন বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। গত ৩ মাস ধরে তিনি ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার সহকর্মীরাও তার বিষয়ে জানেন না। শরীফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মচারী জানান, শরীফুল ইসলাম ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ঋণ ও চড়ামূল্যে সুদসহ টাকা নেওয়ায় পাওনাদারদের চাপে ছিলেন। বিভিন্ন সময় ক্যাম্পাসে টাকার জন্য পাওনাদারদের হাতে শ্লীলতাহানিরও শিকার হয়েছেন তিনি। একারণে তিনি গাঢাকা বা দেশের বাইরে গিয়ে থাকতে পারেন।

শরীফুলের দেওয়া অভিযোগপত্রের উত্তরে পাল্টা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছেন ক্যান্টিন পরিচালক মাসুদ ও প্রক্টর অফিসের কর্মচারী মাসুদ মোল্লা।

মাসুদ তার চিঠিতে দাবি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই করেই তাকে ক্যান্টিন প্রদান করেছে। শরীফুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন।

এবিষয়ে মাসুদ বলেন, ‘আগে কার কাছে মালিকানা ছিল তাতো আমি জানি না। ক্যান্টিনটি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে নিয়েছি। আর ট্রেড লাইন্সেস যে ডুপ্লিকেটের কথা বলা হচ্ছে, এটা মিথ্যা। অরিজিনাল কাগজপত্র দেখেই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে দিয়েছে। বরং সে-ই (শরীফুল) বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা ধার নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এটা নিয়ে ক্যাম্পাসেই অনেকবার বিচারও হয়েছে। হয়তো কারোর ইন্ধনে আমাকে নিয়ে এই ষড়যন্ত্র করছে।'

প্রক্টর অফিসের কর্মচারী মোস্তাক মোল্যা তার চিঠিতে দাবি করেছেন, ক্যান্টিন-সংশ্লিষ্ট কোনও কিছুর সঙ্গে তিনি জড়িত নন। শরীফুল ইসলাম ও মাসুদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন হলেও তার সাক্ষীও তিনি না। শরীফুল ইসলাম তার নামে গুজব ছড়াচ্ছেন।

এবিষয়ে মোস্তাক মোল্যা বলেন, 'শরীফুল ইসলাম ধার দেনায় জড়িয়ে ছিলেন, পাওনাদাররা তাকে অনেকবার মারধরও করতে যেতেন৷ আমিও কয়েকবার তাকে বাঁচিয়েছি। শরীফুল বা মাসুদের লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। শরীফুল এখানে আমাকে কেন জড়াচ্ছে বুঝছি না।’

টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম ফরাজি বলেন, 'আমি বা সাধারণ সম্পাদক এ বিষয়ে কিছুই জানি না। ক্যান্টিনে আমাদের তো যাওয়ারও দরকার নেই, খাবারের মান খারাপ হলে, শিক্ষার্থীদের অসুবিধা হলে— আমরা ক্যান্টিনে যাবো। সে কোন সূত্রে অভিযোগে আমাদের নাম দিলো জানি না। ’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল বলেন, 'আমার দফতরেও শরীফের চিঠি এসেছে। আমার দফতরের একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, সে অস্বীকার করেছে। তাকে তখন রেজিস্ট্রার স্যারকে লিখিত জানাতে বলেছি।'

শরীফের বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমার দফতরেও শরীফের বিচার হয়েছে। টাকা-পয়সা ধারদেনার বিষয় নিয়ে। পাওনাদাররা তাকে নিয়ে আমার কাছে এসেছিল।'

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, 'আমি এধরনের কোনও অভিযোগ পাইনি এখনও। অভিযোগপত্র পেলে খতিয়ে দেখা হবে।’