ধরুন ঢাকা শহরের মধ্যে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। ফায়ার ব্রিগেড পৌঁছে কোথাও পানির উৎস খুঁজে পাচ্ছে না। ভাবছেন শহরজুড়ে পানি আছে, আসলে কিন্তু নেই। পুকুর নেই, খাল নেই, কোথাও কোথাও ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢোকার রাস্তা নেই। পরিস্থিতি কল্পনা করার কথা বলা হলেও, এই ঢাকা শহরে অহরহ ঘটছে এমন ঘটনা। কোনও একটি আগুনের ঘটনা একটু তীব্র হলেই নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারার কারণ হিসেবে প্রথম শোনা যায় ‘পানি সংকট’-এর কথা। কাছাকাছি কোথাও পানির সহজলভ্য উৎস না পেয়ে আগুন নেভাতে সময় লেগে যায় ফায়ার সার্ভিসের।
এদিকে ঢাকার মতো জনবহুল শহরে ফায়ার হাইড্রেন্ট (অগ্নিনির্বাপণ কাজে ব্যবহৃত বিশেষ পানিকল) লাগাতে না পারাকে দুষছেন নাগরিক সমাজ। আর নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেখানকার সব কর্মকাণ্ড বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। পুরো ঢাকা শহরই আগুনের ওপর রয়েছে। একের পর এক আগুনের ঘটনার পরেও কেন এখনও অগ্নিনির্বাপণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণে এত গড়িমসি—প্রশ্ন তাদের।
২০২১ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষ থেকে আগুন নেভানোর কাজে পানির প্রাপ্যতা সহজ করতে রাজধানীর বস্তিগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফায়ার হাইড্রেন্ট বসানো কথা বলেছিলেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা অনুষ্ঠানে তিনি এই কথা জানান। কিন্তু তারপরে কী হলো?
উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, ফায়ার হাইড্রেন্ট লাগানোর একটি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। আমরা এর গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রকল্পটি গ্রহণ করেছি। শিগগিরই পুরো উত্তরে ফায়ার হাইড্রেন্ট লাগানো হয়ে যাবে। এ বিষয়ে ওয়াসার সহযোগিতা লাগে। আশা করছি আমরা সেটি পেয়ে যাবো।
বনানীর কামাল আতাতুর্ক সড়কের ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরেও কয়েক দফা নগর পরিকল্পনাবিদেরা এই একই ইস্যুতে কথা বলেছেন। ফায়ার হাইড্রেন্টের মাধ্যমে এই পানি না পাওয়ার সমস্যার সমাধান হতে পারে। রাজধানীর মতো অপরিকল্পিত নগরীতে সেটি আরও বেশি জরুরি।
প্রসঙ্গত, ফায়ার হাইড্রেন্ট হলো পানি সংরক্ষণাগারের সঙ্গে সংযুক্ত বিশেষ পানিকল। সাধারণত রাস্তার ধারে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করা হয়। এই কলের সঙ্গে ওয়াসার লাইনের যুক্ততা থাকবে। কোথাও অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ঘটনাস্থলে পৌঁছে এই কলের সঙ্গে নল যুক্ত করে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা সরাসরি এই পানি আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করতে পারেন।
গত দুই মাসে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দেখা গেছে। বেশিরভাগ সময় পানি স্বল্পতার কারণে আগুন নেভাতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন ফায়ার ফাইটাররা। সরু রাস্তায় পানি বহনকারী গাড়ি প্রবেশ করতে না পারাও একটি বড় সমস্যা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহর পরিকল্পিতভাবে গড়ে না উঠলেও সরকার ও নগরের দায়িত্বশীলরা চাইলে পুরো ঢাকা শহরজুড়ে ‘স্ট্রিট হাইড্রেন্ট’ বসানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছা। নদীবেষ্টিত ঢাকা শহরে পানির অভাবে আগুন নেভাতে না পারার মতো ঘটনাকে লজ্জাজনক বলে মনে করছেন নগর নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নতুন আইনে বলা আছে নতুন ভবন কিংবা আগে যেসব ভবন রয়েছে সেগুলোতে ফায়ার সেফটি কী রকম হবে। নতুন ভবনগুলোতে ফায়ার সেফটির অংশ হিসেবে পিলার হাইড্রেন্ট তৈরির জন্য ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে সবাই অনুমতি নেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় অনেকেই অনুমতি নেওয়ার পরেও সে অনুযায়ী পিলার হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা করছে না। যার কারণে বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগলে তা নেভাতে গিয়ে পানির সংকট দেখা যায়। এসব বিষয়ে আমরা বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে তদারকি করছি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আখতার মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফায়ার হাইড্রেন্টের কথা অনেক দিন থেকে হচ্ছে। এটা একটা অ্যাডভান্স টেকনোলজি। যদি এটা বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে ‘পানি নেই, পানি নেই’ বলে যে হাহাকার হয় সেটা দূর হবে। কিন্তু তার আগেই যেটা করা জরুরি সেটা হলো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। কেবল চিহ্নিত করলেই হবে না, সেখানে যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। আজ যেখানে আগুন লেগেছে সেটা রাজউক, নগর ভবনের কাছের একটা মার্কেট। সবাই এর অগ্নিঝুঁকির কথা জানতো অথচ কেউ কিছু করতে পারলো না। ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে সব ভবনে অগ্নিনির্বাপণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগী হতে হবে বলে জানান এই নগর পরিকল্পনাবিদ।