বর্তমান সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট থাকা জরুরি। তবে অপব্যবহার হয় এমন জায়গাগুলো সংশোধনী দরকার। কোনও আইন কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য হয় না। দেশের আপামর জনতাকে নিরাপত্তা দিতে আইন তৈরি হয়। শনিবার (১৫ এপ্রিল) এডিটরস গিল্ড বাংলাদেশের আয়োজনে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিতর্ক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। সকাল ১১টায় বনানীর ঢাকা গ্যালারিতে সমবেত হন তারা।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, ‘বর্তমানে ডিজিটাল জগতে অপরাধ ও শঙ্কা অনেক বেশি। ফলে সম্মিলিতভাবে এটাকে মোকাবিলা করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ডিজিটাল যুগে কোনও একটি দেশ যদি আক্রান্ত হয় তাহলে সেটা অন্য অনেক দেশের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’
আলোচনায় মানবাধিকার আইনজীবী জেড আই খান পান্না বড় কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করে এই আইনের দুর্বলতা তুলে ধরেন।
ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর ২১ ধারা উল্লেখ করে ব্যারিস্টার ফারজানা মাহমুদ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা, পতাকার সম্মান রক্ষার যে বিষয়গুলো এই ধারায় বলা হয়েছে, আমি এর সঙ্গে একমত। ইউরোপিয়ান কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটসে বলা আছে, ‘পিস অ্যান্ড জাস্টিস’-এর বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু বাক-স্বাধীনতায় প্রযোজ্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অংশটি একটু বিস্তারিত বিষয়, কিন্তু এটি সুনির্দিষ্টভাবে বলে দেওয়া দরকার। বরং নারীদের সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রেখে বিধান তৈরি করা দরকার।”
এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবুর সঞ্চালনায় বৈঠকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘কোনও আইন করতে গেলে এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হয়। একটা সময় গেছে যখন আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলেছে। এমন সময় গেছে যখন কোনও একটা ব্লগ দিয়ে সেটা নিয়ে দূতাবাসে গিয়ে নিরাপত্তার হুমকি উল্লেখ করে বিদেশে চলে যায়, বিচারের বাইরে চলে যায়। ফলে এই আইনের প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই হয়েছে। তবে কিছু অপপ্রয়োগ হচ্ছে, এটা তো আইনের দোষ নয়। নওগাঁর ঘটনায় যে ডিএসএ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা কি সরকার করেছে? অপব্যবহারের কথা তো আমরা স্বীকার করেছি। এখনও এই আইন সংশোধন নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে।’
ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, ‘দেশে এখন ১৪ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন, ৬ কোটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ডিজিটালি যে নিরাপত্তার কথা বলা হয় সেটা জরুরি। অপব্যবহারের বিষয়টি লক্ষ্য করা দরকার। আমার প্রশ্ন হলো, এই আইন কি রক্ষা করতে পারছে?’
রামু, কুমিল্লাসহ বেশকিছু সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কথা উল্লেখ করে শ্যামল দত্ত বলেন, ‘ডিজিটাল অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার কি আমরা দেখতে পেয়েছি? গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যখন ব্যবহার হতে দেখি আমি উদ্বিগ্ন হই। একটা আইন চাই, যে আইন আমাকে সুরক্ষা দেবে। যে আইন উল্টো আমাকে বিপদে ফেলবে সেটা চাই না।’
বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ উল্লেখ করেন, এই আইন প্রণয়নের আগে তিন বছরব্যাপী বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। তার মন্তব্য, ‘আইনের প্রয়োজনে রয়েছে বলেই সেটা প্রণয়ন হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। পুলিশ সাইবার সাপোর্টে ২৪ হাজার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ১৪ হাজারকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তার মানে এসব ঘটছে। আজ এই আইন না থাকলে কী পরিস্থিতি হতো একবার কল্পনা করে দেখুন। আইন কোনও ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জন্য হয় না। আইন হয় আপামর জনতার জন্য। আমরা আইনটিকে খুব ছোট লেন্স দিয়ে দেখছি।’
আইনটি ব্যবহার করতে গিয়ে একবারও অপব্যবহার হলে সেটি অপব্যবহার হিসেবে দেখেন মানবাধিকার নেত্রী খুশী কবীর। তিনি আলোচনায় বলেন, ‘যারা অনেক জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পায় না তাদের সঙ্গে আমার কাজের সুযোগ আছে। আমি নিজেও একজন নাগরিক হিসেবে এই আইনের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের ভাবনা জানার সুযোগ পাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমার কাছে মানদণ্ড নয়। আমি এই আইন, আইনের প্রয়োগ ও ব্যবহার নিয়ে ভাবতে চাই। এ আইন নিয়ে যে ভীতি তৈরি হয়েছে, এখন সেটি দূর করার দায়িত্ব আমাদের। কেন ভীতি হলো? কারণ এটা অপব্যবহারের অনেক সুযোগ আছে। একটা অপব্যবহার হলেও সেটা অপব্যবহার।’
আর্টিকেল নাইনটিন-এর প্রতিনিধি ফারুক ফয়সাল বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন দুটো জগৎ- একটা বাস্তব, একটা ডিজিটাল জগৎ। নিরাপত্তা জরুরি ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু যে আইন আছে সেটা সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। যে আইন জনগণকে ভয় দেখায়, যে আইনে মানুষ আতঙ্কিত হয়, যে আইনে সাংবাদিকরা সেল্ফ সেন্সর করে। এছাড়া এই আইনে প্রতিদিন মামলা বাড়ছে।’