একাত্তরে গণহত্যা, অপহরণ, লুটপাট: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোন্তাজ গ্রেফতার

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া যুদ্ধাপরাধী মো. মোন্তাজ আলী ব্যাপারি ওরফে মমতাজকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৩)। শনিবার (২৯ এপ্রিল) রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার চন্দ্রা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সে দীর্ঘদিন পলাতক ছিল।

রবিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর টিকাটুলির র‍্যাব-৩ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার আসামি মোন্তাজসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের একই মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়। ১৯৭১ সালে গঠিত জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী মোন্তাজ জামায়াতে ইসলামীর গাইবান্ধা সদরের সক্রিয় সদস্য ছিল। গাইবান্ধা সদর এলাকার শান্তি কমিটি এবং সশস্ত্র রাজাকার বাহিনীর প্রধান সংগঠক ছিল মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি আব্দুল জব্বার। তার সঙ্গে যোগসাজশে মোন্তাজ শান্তি কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে ওই এলাকায় লুটপাটসহ বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কার্যক্রম চালাতো।’

র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলন

আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, ১৯৭১ সালের ১ জুন সকাল ১০টার দিকে মোন্তাজ, আব্দুল ওয়াহেদ, জাছিজার রহমান, আব্দুল জব্বার, রঞ্জু মিয়া ও হেলাল এবং পাক আর্মি ক্যাম্প থেকে হানাদার ও রাজাকারের ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল গাইবান্ধা সদর থানার বিষ্ণুপুর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পূর্ব পরিকল্পিত হামলা চালায়। পূর্ব শত্রুতার জেরে মোন্তাজ ও তার সহযোগী ওয়াহেদ, জাছিজারসহ অন্যান্য সহযোগী এবং রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট করে অম্বিকাচরণ সরকার ও আব্দুর রউফের বাড়িতে। একপর্যায়ে তারা অম্বিকাচরণের মুখে, মাথা ও শরীরে বাঁশ দিয়ে বেধড়ক মারপিট করে। আঘাতের ফলে মৃতপ্রায় হয়ে পড়লে তাকে ফেলে রেখে লুটপাট করা মালামাল নিয়ে স্থান ত্যাগ করে তারা। এরপর রাজাকার ও পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে মোন্তাজ এবং ওই মামলার অপর আসামিরা একই গ্রামের দ্বিজেশচন্দ্র সরকারের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট করে। এছাড়াও ফুলকুমারী রানি ও সন্ধ্যা রানিকে নির্যাতন করে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায়। ওই ঘটনায় সেই বাড়ির মালিক দ্বিজেশচন্দ্র বাধা দিতে গেলে তাকে গাইবান্ধা আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। পরে তা মরদেহ গুম করে। এছাড়াও তারা ওই এলাকার অসংখ্য বাড়িতে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, অপহরণসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালিয়ে পরিবারগুলোকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করে।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের এই অধিনায়ক জানান, ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে মোন্তাজ, রঞ্জু, জব্বার, জাছিজার ও ওয়াহেদ মিলে গাইবান্ধা সদরের নান্দিনা গ্রামে সশস্ত্র হামলা চালায়। সেই হামলাকালে তারা ওই গ্রামের আবু বক্কর, তারা আকন্দ, আনছার আলী ও নছিম উদ্দিন আকন্দকে গুলি করে হত্যা করে। ওই সময় আসামিদের নেতৃত্বে একই গ্রামের সামাদ মোল্লা, শাদা মিয়া, ফরস উদ্দিন ও সেকান্দার আলী মোল্লাকে বাড়ির সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি সেই দিনে মোন্তাজের নেতৃত্বে তারা ৪০টিরও বেশি বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে।

একই দিনে তারা ২৫ জন সশস্ত্র রাজাকার এবং ৩০ জন পাকিস্তানি সেনা নিয়ে পাশের দৌলতপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে লাল মিয়া ব্যাপারি, আব্দুল বাকী, খলিলুর রহমান, দুলাল মিয়া, মহেশচন্দ্র মণ্ডলকে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এছাড়াও গাইবান্ধা সদর এলাকার নান্দিনা, মিরপুর, সাহারবাজার, কাশদহ, বিসিক শিল্পনগরী, ভবানীপুর ও চকগায়েশপুর গ্রামে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, ইসলাম উদ্দিন ও নবীর হোসেনসহ সাত জনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

আরিফ মহিউদ্দিন জানান, ২০০৯ সালে গাইবান্ধা অধস্তন আদালতে আসামি মোন্তাজসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মামলা করেন নির্যাতিত আব্দুর রউফ। পরে ২০১৪ সালে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলে মোন্তাজসহ অন্য আসামিরা ২০১৬ সাল পর্যন্ত জামিনে থাকে। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে এবং পরবর্তী জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হলে তারা আত্মগোপনে চলে যায়। এরপর তদন্তে প্রতিটি অভিযোগ প্রসিকিউশনের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে ২০১৯ সালে পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

মামলার রায় হওয়ার পর পলাতক অবস্থায় দুই আসামি (আব্দুল জব্বার ও রঞ্জু মিয়া) মারা যায়। ইতোপূর্বে ওই মামলার আসামি জাছিজার রহমান ও আব্দুল ওয়াহেদ মণ্ডলকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। সবশেষে মামলার আসামি মোন্তাজকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৬ সাল থেকে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন সময় পর্যন্ত সে কখনোই আদালতে হাজিরা দেয়নি। শুনানিতে হাজিরা না দেওয়ায় মোন্তাজের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এর পরপরই সে নিজ বাড়ি ছেড়ে গাইবান্ধা সদরে জামাতার বাড়িতে আত্মগোপন করে। সেখান থেকে প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বড় ছেলে শফিকুল ইসলামের ভাড়া বাসায় আসা-যাওয়া করতে থাকে। ছেলের বাসা নিজ জেলা থেকে দূরে হওয়ায় নিরাপদ ভেবে ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস করছিল মোন্তাজ।