নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১: আমরা কেন উদ্বিগ্ন?’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) লেকচার থিয়েটার ভবনের আর সি মজুমদার মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছিলেন আয়োজকরা। বুধবার (১৩ ডিসেম্বর) দুপুর আড়াইটায় সভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু সভা শুরুর আগ মুহূর্তে ওই মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে বলে জানান ঢাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুল বাছির। এর প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষকরা।
অধ্যাপক আবদুল বাছির আয়োজকদের জানান, প্রোগ্রামটি ‘সরকার বিরোধী’ জানিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংস্থা সভা বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়।
সভাটি কেন করতে দেওয়া হলো না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আয়োজকদের লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু দুপুর ২টায় খবর পাই, প্রোগ্রামটি রাষ্ট্র, সরকার ও আমাদের জাতিসত্তাকে আঘাত করতে পারে। সে কারণে আয়োজকদের ফোন করে সভাটি অন্যস্থানে করার কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন থাকে। তাছাড়া এই মিলনায়তনটি দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নীতিমালায়ও সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধীতার শঙ্কা থাকলে অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল।’
এদিকে সভা করতে না দেওয়ায় তাৎক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে মানববন্ধন করে আয়োজক সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘আমরা নতুন শিক্ষাক্রমের ভালো-খারাপ ও ফাঁক-ফোকড় নিয়ে আলোচনার জন্য একটি আলোচনা সভা করতে চেয়েছি। এ ধরনের একটি সভায় যারা বাধা দেয়, তারা রাষ্ট্রের মঙ্গল চায় না। বর্তমান যে শিক্ষাক্রম করা হয়েছে, রাষ্ট্রের কেউ তার দাবি করেছিল? তবুও একটি নতুন শিক্ষাক্রম চাপিয়ে দেওয়া হলো, যা একটি খোলস মাত্র।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা কারিকুলাম নয় বরং অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন না দেওয়া, স্কুল ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনীতির প্রবেশ শিক্ষাব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে। কোনও সরকার শিক্ষার মান পরিবর্তনে ব্যবস্থা নেয়নি। কয়েকটি মিশনারি স্কুল বাংলাদেশ ছেড়ে গেলে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পাতালে চলে যাবে।’
খোলস বদলালেই সব ঠিক হয়ে যাবে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘পুরনো কারিকুলামে কোচিং বাণিজ্য হয়, শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করতো বলে দোষারোপ করা হলো। এটি মিথ্যা কথা। কোচিং বাণিজ্য হয় ভালো শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ার কারণে। শিক্ষকরা লেখাপড়া ছাড়া অন্য সব কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফটোকপি দিয়ে পড়াশোনা চলে, পাঠ্যবই খুলে দেখার সময় পায় না।’
নতুন শিক্ষাক্রম চালুর জন্য যে উপযুক্ত পরিবেশের প্রয়োজন, তা তৈরি করা হয়নি মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও একটি কারিকুলামের শতভাগ একসঙ্গে পরিবর্তন করা হয় না। সর্বোচ্চ ২০ শতাংশে পরিবর্তন আনে, যাতে ভুল হলেও তার নেতিবাচক প্রভাব কম পড়ে। বাংলাদেশে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয় নিয়ে আসা হয়েছে। পৃথিবীর আর কোথাও এই বিষয় এভাবে পড়ানো হয় না। অথচ নবম-দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞানকে সংকুচিত করা হয়েছে।’ নতুন শিক্ষাক্রমে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন থেকে তথ্য প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী আমাদের শিক্ষাক্রম বদলের কথা বলা হচ্ছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের অনার্সের আগ্রহের বিষয় শিক্ষাবিজ্ঞান। শুধু এ বিষয়ে অনার্স করলেই হয় না। তিনি শিক্ষকতা করতে চান কিনা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি জিজ্ঞাসা করা হয়। এটা হতে হয় তার প্রথম পছন্দ। এদিকে বাংলাদেশে সব স্থানে ব্যর্থ হয়ে একজন ব্যক্তি শেষ প্রাইমারি শিক্ষকের চাকরি করেন। তাদের বেতনও অসম্মানজনক। নতুন শিক্ষাক্রমের বইয়ে চরম অবহেলা করা হয়েছে। প্রচ্ছদ তৈরি, কাগজের মান, বইয়ের কন্টেন্ট সবকিছুতেই অবহেলা করা হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিমুদ্দিন খান বলেন, ‘যে শিক্ষাক্রম মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ভালো-খারাপ দিক নিয়ে আলোচনা করা দরকার। শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে কথা বলা আমার নাগরিক ও নৈতিক অধিকারে পরিণত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যেকোনও ধরণের বিতর্ককে ভয় পাওয়া সরকারের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ। আমাদের প্রোগ্রামটি খুবই কোমল একটি আয়োজন ছিল। বাংলাদেশের সংবিধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার-১৯৭৩ আমাদের মত প্রকাশের ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু আমাদের মত প্রকাশে বাধা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আজ একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ে প্রবেশ করলো।’
সম্মিলিত শিক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক রাখাল রাহা বলেন, ‘যেসব অভিভাবক শিক্ষা নিয়ে কথা বলছেন, তাদের মামলা দেওয়া হয়েছে; রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাব এমন– শিক্ষাক্রম এতই ভালো যে, এ বিষয়ে কথা বলা যাবে না। অভিভাবকরা কোথাও দাঁড়াতে পারছেন না। তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকদের চাকরি, বেতন ও ম্যানেজিং কমিটির ভয় দেখিয়ে চুপ করানো হয়েছে।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞানের ৩০ শতাংশ রেখে বাকি অংশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিজ্ঞান ও গণিতকে বাদ দিয়ে শিল্প ও সংস্কৃতি, জীবন ও জীবিকা বিষয় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো কারিগরি শিক্ষার অংশ হতে পারে, মূলধারার নয়। এভাবে চললে আগামীতে বিদেশ থেকে প্রশাসক আমদানি করতে হবে।’
প্রতিবাদ সভায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন।