লোকজ মেলায় তিন লক্ষাধিক লোকসমাগমের আশা

বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবের ৩৩তম আসরের উদ্বোধন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের চত্বরে মাসব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার। মেলায় তিন লক্ষাধিক দর্শনার্থী সমাগমের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার বলেন, বিভিন্ন অপশক্তির নানা বাধা উপেক্ষা করে আজ আমরা একটি শুভ দিনে মিলিত হতে পেরেছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও তার আগে জ্বালাও পোড়াও সহিংসতা উপেক্ষা করে ফের আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই সরকারের আমলে উন্নয়ন হয়। আর ওরা শুধু জ্বালাও পোড়াও করে। আজকে এই খুশির দিনে আমি বলতে চাই, এই মেলা ও জাদুঘরের জন্য যা যা করার দরকার, তা আমি করবো। আমি সবসময় আপনাদের সঙ্গে আছি। 

এ সময় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমেদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ইমরুল চৌধুরী, সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম ভূঁইয়া, সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুদুর রহমান মাসুম, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ-অঞ্চল) শেখ বিল্লাল হোসেনসহ প্রমুখ।

সকাল থেকে মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের সমাগম বাড়তে থাকে। বেলা গড়িয়ে বিকাল হতেই চারদিকে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।

মেলায় বিভিন্ন রকমের পণ্য নিয়ে স্টল সাজিয়েছেন কারুশিল্পী, উদ্যোক্তা ও স্টল মালিকরা। সেসব স্টলে স্টলে দর্শনার্থীরা নানা পণ্য কিনতে ভিড় করছেন, কেউ আবার ঘুরে ঘুরে নানা পণ্য দেখছেন। তবে মেলায় নাগরদোলা, চরকি, বায়োস্কোপ ও পুতুল নাচ, নকশিকাঁথা, জামদানি শাড়িসহ নানা পণ্য দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে।

সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া এলাকা থেকে স্বামী ও সন্তান নিয়ে মেলায় ঘুরতে এসে রুমা বেগম বলেন, মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে এসেছি। সবগুলো স্টল ঘুরে ঘুরে দেখছি। এখনো তেমন কিছু কিনিনি। তবে জামদানি শাড়ি কেনার ইচ্ছা আছে। এছাড়া রান্নার জিনিসপত্রসহ ব্যতিক্রম কিছু পেলে কিনবো।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, দেশীয় সংস্কৃতি সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রতি বছরের মতো এবারও মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। মেলা ও লোকজ উৎসব চলবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে।

উৎসবে কারুশিল্প প্রদর্শনী, লোকজীবন প্রদর্শনী, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ, নাগরদোলা ও গ্রামীণ খেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পীদের তৈরি বাহারি পণ্যসামগ্রী এবং উদ্যোক্তাদের কারুপণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে।

উৎসবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাউল গান, পালাগান, যাত্রাপালা, লালনগীতি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি সারি, হাছন রাজার গানসহ গ্রামীণ খেলা, সাপের খেলা, লাঠি খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো ও পিঠা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।

এবারের মেলায় কারুশিল্পী প্রদর্শনীর ৩২টিসহ সর্বমোট ১০০টি স্টল রয়েছে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ৬৪ জন কারুশিল্পী অংশ নিচ্ছেন। এবারও মেলায় বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে কারুশিল্প উদ্যোক্তাদের ১৫টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আছে মৌলভীবাজার ও ঝালকাঠির শীতল পাটি, মাগুরা ও ঝিনাইদহের শোলাশিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, মুখোশ ও মাটির পুতুল, রংপুরের শতরঞ্জি, ঠাকুরগাঁওয়ের বাঁশের কারুশিল্প, সোনারগাঁ ও টাঙ্গাইলের জামদানি, কাঠের চিত্রিত হাতি ঘোড়া পুতুল, ঠাকুরগাঁওয়ের বাঁশ-বেতের কারুশিল্প, ঐতিহ্যবাহী জামদানি, বন্দরের রিকশা পেইন্টিং, কুমিল্লার তামা-কাঁসার তৈজসপত্র, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কারুশিল্প, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা পুতুল, বগুড়ার লোকজ খেলনা ও বাদ্যযন্ত্র।

মেলার আয়োজন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক একেএম আজাদ সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মাসব্যাপী এই আয়োজন আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্বোধন করেছি। আমাদের লোক ও কারুশিল্প মেলা একটি বিশেষায়িত মেলা।

বাংলার ঐতিহ্যকে যারা ধারণ করতে চায়, তারা এই মেলায় আসলে এক বাক্যে তা পূরণ হবে। এক প্রাঙ্গণে তারা লোক কারুশিল্পীদের পণ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। নতুন প্রজন্ম এই কারুশিল্প দেখে উদ্বুদ্ধ হবে। মেলায় আসা পণ্য দেখে নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। প্রতি বছরের মতো এবারও মেলাটি সার্থক হবে। পাশাপাশি আমরা নতুন কিছু সংযোজন রেখেছি। লোকজ মোটিভের মাধ্যমে আমরা সাজসজ্জা করেছি। ৬৪ জন কারুশিল্পীর সম্মেলনের মাধ্যমে প্রদর্শনের আয়োজন করেছি।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাউলশিল্পীদের দিয়ে হাসনরাজা, পালাগানসহ নানা আয়োজন করা হয়েছে। এক কথায় মেলাটি উপভোগ্য হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এবারের মাসব্যাপী মেলার আয়োজনে তিন লক্ষাধিক দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে আশা করছি।  

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী নুরুল ইসলাম বলেন, মাসব্যাপী এই অনুষ্ঠানে দেশব্যাপী কারুশিল্পী ও কারুশিল্প পণ্য প্রদর্শনী হবে। লোকজ ঐতিহ্য ভাটিয়ালি, বাউল গানসহ লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত সব ধরনের কারুপণ্যের সম্মেলন হবে। ৩২টি কারুপণ্যের স্টলে ৬৪ কারুশিল্পী নিজ হাতে তৈরি পণ্য প্রদর্শনী ও বিক্রয় করবেন।

বায়োস্কোপ, পুতুল খেলা, দাড়িয়াবান্দাসহ দেশি যে-সব খেলা রয়েছে, তাতে সোনারগাঁয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করবে। প্রতিদিন বিকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করবেন। তাই মেলা ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যাতে দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে মেলা উপভোগ করতে পারেন।