অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সেসব সমালোচকদের প্রসঙ্গে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, ‘অনেকে বলছেন এটি তো রাজনৈতিক সরকার নয়। এটি সংবিধান সম্মত সরকারও নয়। তাদের বলছি, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানই এই সরকারের বৈধতা দিয়েছে। আর যে সংবিধানের কথা বলা হচ্ছে সেটিও নিজেই নিজেকে বিলুপ্ত করেছে। সংবিধানের মূল কথা ছিল, মানুষে মানুষে কোনও বৈষম্য থাকবে না। সবাই তার প্রতিভা অনুসারে ফলাফল পাবে। সেটি কী হয়েছে?’
বুধবার (১৬ অক্টোবর) বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবে কবিতা ও কবিদের কবিতা পাঠ’ শিরোনামের আয়োজনে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশে গণতন্ত্র শব্দটিকে অর্থহীন করে দিয়েছে। গণতন্ত্র শব্দটির মর্ম কথাই ফ্যাসিবাদ গুম করে দিয়েছে। যে শাসন ব্যবস্থা দিনের পর দিন মানুষের অধিকার খর্ব করে, মানুষকে গুম করে রাখে সেটি কী প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিল? পনের বছরের বেশি সময় ধরে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা কায়েম থাকায় গণতন্ত্র শব্দটিই গুম হয়ে গেছে।’
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে অনেকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগও এনেছেন আন্দোলনের সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলন-সংগ্রামের হোতাদের বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের দুস্কৃতিকারী, জঙ্গি বলা হয়েছে। কিন্তু যারা ক্ষমতা ধরে রেখে দীর্ঘদিন জনগণের ওপর অত্যাচার করেছে তারাই তো আসলে জঙ্গি।’
গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রসঙ্গে তিনি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে গুরুত্বারোপ করে বলেন ‘তিন ধরনের শাসন ব্যবস্থার মধ্যে সমাজতন্ত্র যখন অধোগতির দিকে যায় তখন সেটিকে আমরা গণতন্ত্র বলি। গণতন্ত্রের এই যুগে আমরা তো কেবল স্বৈরতন্ত্রই দেখছি। আমরা যে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলছি সেটি আসলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য যদি দূর করতে পারি। কিন্তু সেটি বেশ দীর্ঘ প্রক্রিয়া। স্বল্প সময়ে যেটি করতে পারি, সেটি হলো আমরা জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারি, যেখানে তারা একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন। তাহলে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হবে।’
জুলাই-আগস্টের বিপ্লবে জাতীয় কবিতা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে আন্দোলনে জাতীয় কবিতা পরিষদের ভূমিকা কী ছিল? তারা মানুষের মনের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারেনি। তারা তো আসলে কবি নন, হয়ে গেছেন আমলা। কবিদের কাজ তো শুধু কবিতা লেখা না, সমাজেও তো তাদের ভূমিকা থাকা দরকার।’
সলিমুল্লাহ খান সভার শুরুতে জানান, তিনি দুই বার বাংলা অ্যাকাডেমির সাধারণ সদস্যপদে আবেদন করেছিলেন। তার সেই আবেদন গ্রাহ্য করেনি অ্যাকাডেমি। এমনকি অ্যাকাডেমির লেখক অভিধানেও তার নাম লিপিবদ্ধ হয়নি বলে অনুযোগ করেন তিনি।
২০০৯ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদের জাতীয় কবিতা উৎসবে শামসুর রাহমানের ‘স্যামসন’ কবিতা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন সলিমুল্লাহ খান। সেদিন প্রয়াত কবি রফিক আজাদের নেতৃত্বে একদল তরুণ কবি তাকে মারতে উদ্যত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকে সলিমুল্লাহ খান জাতীয় কবিতা পরিষদের কোনও আয়োজনে আসেননি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের আহ্বায়ক কবি মোহন রায়হান। স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সদস্য সচিব কবি রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন। বক্তা হিসেবে ছিলেন গীতিকবি শহীদুল্লাহ্ ফরাজী ও মনিরুল ইসলাম মনি।