রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও শনাক্ত হয়নি ছয়টি মরদেহের পরিচয়। একাধিক শিশুর দেহ আগুনে এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বুধবার (২৩ জুলাই) থেকে শুরু করেছে বাবা-মায়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ কার্যক্রম।
সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার সম্পা ইয়াসমিন জানান, “সিএমএইচে রাখা ছয়টি অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তের জন্য আমরা বুধবার সকাল থেকে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছি। এদিন ১১ জন বাবা-মায়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখনও আরও অভিভাবক আসবেন বলে আশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিশুর ডিএনএ শনাক্তে বাবা-মায়ের নমুনা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর। আমরা অনুরোধ করছি, যাদের সন্তান এখনও নিখোঁজ, তারা যেন সরাসরি সিআইডি অফিসে এসে নমুনা দেন। এটি তাদের সন্তানের সঠিক মরদেহ শনাক্তে সহায়তা করবে।”
মালিবাগে সিআইডি অফিসে গিয়ে ডিএনএ নমুনা দেওয়া যাচ্ছে। সংস্থাটি জানায়, এখনও যারা সরকারি নিখোঁজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি, তারাও নমুনা দিয়ে যেতে পারবেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, এ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২৯ জনের, চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬৯ জন। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার হালনাগাদে কিছুটা সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হাসান মো. মঈনুল আহসান বলেন, “তথ্য সমন্বয়ে আমরা সময় নিচ্ছি। যাতে একাধিক উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে। ভুল ও বিভ্রান্তি দূর করাই আমাদের উদ্দেশ্য।”
হতাহতের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহে নিয়ন্ত্রণকক্ষ, স্কুল কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটি
স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও আগত অভিভাবকদের প্রকৃত হিসাব জানতে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলমকে। কমিটিতে আছেন উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষিকা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি।
এই কমিটি আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে হতাহত ও নিখোঁজদের তালিকা ঠিকানাসহ প্রস্তুত করে জমা দেবে। স্কুলের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে খুলে দেওয়া হয়েছে নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোল রুম), যেখানে পাওয়া যাচ্ছে আহত, নিহত ও নিখোঁজদের আপডেট তথ্য। কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে দুটি নাম্বারও দেওয়া হয়েছে। ০১৯৬৩-৮৩৫৬২৬ (প্রধান শিক্ষিকা), ০১৭১৩-০৯১৪১৭ (কো-অর্ডিনেটর)।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পর্যবেক্ষণ: গোপন নয়, স্বচ্ছতা নিশ্চিতই সরকারের লক্ষ্য
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে জানান, “সরকার হতাহতের সংখ্যা গোপন করছে না, বরং স্কুলের উপস্থিতির হিসাব, বিভিন্ন হাসপাতাল এবং নিহতের স্বজনদের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “২০০২ সাল থেকে এতগুলো দুর্যোগ কাভার করেছি— দেখেছি বাংলাদেশে হতাহতের সংখ্যা গোপন করা সম্ভব না। এ ঘটনাতেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্কুলে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে, সেনাবাহিনী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও যুক্ত আছে।”
মাইলস্টোন ক্যাম্পাসজুড়ে পোড়াগন্ধ
ঘটনার তিন দিন পরও বুধবার (২৩ জুলাই) স্কুল ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা গেলো এক ভয়াবহ পরিবেশ। কোলাহলহীন, নীরব-নিস্তব্ধ, পোড়ার গন্ধে ভারী সেখানকার বাতাস। শ্রেণিকক্ষগুলো ভাঙা চেয়ার-টেবিলে ভরে আছে। মেঝেতে পোড়া কাঠ, জানালার কাচ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।
এক অভিভাবক বলছিলেন, “সন্তান যদি স্কুলেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের আশ্রয় কোথায়?”
বেঁচে যাওয়ারাও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, স্বজনদের আর্তনাদ
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪৩ জন শিশু। আগুনে দগ্ধ হয়ে অনেকের শরীরের ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। কান্না, ছটফটানি আর চিৎকারে ভরে উঠেছে বার্ন ইউনিট। আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ১২ জন।
হাসপাতালের ওয়ার্ডজুড়ে কান্নার আওয়াজ, আর্তনাদ আর দোয়ার হাত। অভিভাবকরা কখনও মেঝেতে বসে কাঁদছেন, কখনও দরজায় উঁকি দিয়ে সন্তানদের এক ঝলক দেখতে চাইছেন।
মাইলস্টোনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহতাব রহমান ভূঁইয়া (১৫)। শরীরের ৭০ শতাংশ দগ্ধ। আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। বাবা-মা বলছেন, “আল্লাহ, আমার বাচ্চাটারে সুস্থ করে দাও।”
তামজিদ হোসেনের ভাগ্নির অবস্থা আরও সংকটজনক। পুরো মুখমণ্ডলসহ শরীরের বড় অংশ ঝলসে গেছে। শিশুটি বারবার বলছে, “মা, বাতাস করো... মামা, বাতাস করো।”
সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল ঢাকায়
আহতদের চিকিৎসায় সহায়তা দিতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল ও সিং হেলথের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঢাকায় এসেছে। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাতেই তারা পৌঁছান এবং বুধবার (২৩ জুলাই) সকালে চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
দলে আছেন ডা. চং সি জ্যাক, বিজয়া রাও, পুন লাই কুয়ান এবং ম লিম ইউ হান জোভান। তারা জাতীয় বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছেন।
মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে বেঁচে গেলাম: আতিয়ার সাক্ষ্য
মাইলস্টোনের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী আতিয়া ফাইরুজ আনিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আমি শিশু শ্রেণির ক্লাসে যাই। ৩০ মিনিট পর নিজের ক্লাসে ফিরে যাই। এরপরেই বিকট শব্দ... আমি ভেবেছিলাম বোমা ফুটেছে। পরে দেখি আগুন, ধোঁয়া আর মানুষের চিৎকার। আমি এখনও বুঝতে পারছি না কীভাবে বেঁচে গেছি...।”
প্রশিক্ষণ বিমান ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে ও কেন উড়ল? বেসামরিক এলাকায় বিমান চলাচল বন্ধে কতটা সতর্কতা ছিল? নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কি ঘাটতি ছিল? এত শিশু মৃত্যুর দায় কে নেবে? বিভিন্ন মহল থেকে এসব প্রশ্ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এসব প্রশ্নে উত্তর খুঁজছেন।
এই ঘটনায় যারা বেঁচে আছেন, তারা এখন জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যাদের সন্তান নিখোঁজ— তারা এখনও মরদেহের পরিচয়ের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। সিআইডি জানিয়েছে, উত্তরায় বিমান দুর্ঘটনায় এখনও যাদের পরিবারের সন্তান বা স্বজনদের খোঁজ মিলছে না। মালিবাগে সিআইডির অফিসে এসে তাদের ফরেনসিক বিভাগে ডিএনএ নমুনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।