পুলিশের পোশাকে সেদিন হিন্দি কথা বলতে শুনি: ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দি

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় জড়ো হওয়া হাজারও ছাত্র-জনতার বিপরীতে থাকা পুলিশের পোশাক পরা কেউ কেউ হিন্দি ভাষায় কথা বলছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ আহম্মেদ।

বুধবার (১৩ আগস্ট) চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে রাজধানীর চানখারপুলে ছয় জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিহত মো. ইয়াকুবের চাচা এ জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে ৪০ বছর বয়সী শহীদ আহম্মেদ বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে আমি, আমার ভাতিজা ইয়াকুব, আমার ছেলে সালমান, এলাকার রাসেল, সুমন, সোহেলসহ আরও অনেকে গণভবনের উদ্দেশে রওনা দেই। সাড়ে ১১টায় চানখারপুল এলাকায় পৌঁছালে দেখি হাজার হাজার লোক চারদিক থেকে জড়ো হচ্ছিলেন। তখন চানখারপুল মোড়ের উল্টো পাশে অনেক পুলিশ ও ছাপা পোশাকধারী পুলিশ ছিল। ওই সময় পুলিশের পোশাক পরিহিত লোকদের হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনি। এমনকি তারা আমাদের বাধা দিচ্ছিলো। একইসঙ্গে আমাদের লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছোড়ে।’

তিনি বলেন, ‘ফাঁকা গুলি ছুড়তেই আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। আবার আমরা সামনে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখন আমাদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালায় পুলিশ। এতে আমার পাশের একজনের পায়ে গুলি লাগে। তাকে আমি সরাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই একজন বলে ওঠেন—আপনার ভাতিজা ইয়াকুবের গায়ে গুলি লেগেছে। আমি ওই ছেলেকে আরেকজনের কাছে রেখে ভাতিজার কাছে যাই। পরে আরও দুজনসহ ভাতিজাকে অটোরিকশায় করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা বলেন, ইয়াকুব মারা গেছে। আমি আমার ছেলে সালমানকে ফোন করে ইয়াকুবের মাকে জানানোর জন্য বলি। তাকেও হাসপাতালে আসতে বলা হয়।’

সাক্ষী শহীদ আহম্মেদ বলেন, ইয়াকুবকে কারা গুলি করেছে তা পরে জেনেছি। গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী। ডিএমপির মো. ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদের উপস্থিতিতে কনস্টেবল সুজন, নাসিরুল ও ইমাজ গুলি করেছিলেন। আরও অনেকেই ছিলেন। আমি আসামিদের বিচার চাই।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানিতে ছিলেন, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম প্রমুখ। আসামিপক্ষে ছিলেন, আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ।

গত ১৪ জুলাই এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগ গঠনকালে গ্রেফতার চার আসামি ইন্সপেক্টর আরশাদ, কনস্টেবল মো. সুজন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন ও কনস্টেবল নাসিরুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেন। এই মামলায় মোট আট আসামির মধ্যে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ চার আসামি পলাতক রয়েছেন।

জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুলে গুলি করে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তারা হলেন—ইন্সপেক্টর আরশাদ, কনস্টেবল মো সুজন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন ও কনস্টেবল নাসিরুল ইসলাম।

এই মামলার পলাতক চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে গত ৩ জুন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ৩ জুন ট্রাইব্যুনাল যাদের বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে নির্দেশ দেন তারা হলেন—ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল।

তদন্ত সংস্থা এই মামলায় প্রতিবেদন দাখিলের পর চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত সংস্থার দেওয়া এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদনটি ৯০ পৃষ্ঠার। তদন্ত করতে সংস্থাটির সময় লেগেছে ৬ মাস ১৩ দিন। তদন্ত প্রতিবেদনে ৭৯ সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়। এছাড়া ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি রিপোর্ট, দুটি অডিও, বই ও রিপোর্ট ১১টি এবং ছয়টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে আসামি করা হয় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৮ জনকে। তাদের মধ্যে গ্রেফতার আছেন ইন্সপেক্টর আরশাদ, কনস্টেবল মো. সুজন, কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন ও কনস্টেবল নাসিরুল ইসলাম।