বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস 

মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে তরুণ প্রজন্ম: আত্মহত্যা বাড়ছে কেন

বাংলাদেশে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা গত কয়েক বছরে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। পড়াশোনার চাপ, অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা, হতাশা, একাকিত্ব, প্রেম-সম্পর্কের জটিলতা, পারিবারিক প্রত্যাশা— সব মিলিয়ে তরুণরা ভীষণভাবে মানসিক সংকটে পড়ছেন।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৪০ জন আত্মহত্যা করছেন। আর এর উল্লেখযোগ্য অংশই তরুণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এখনই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।

আজ (১০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। ১৯৯২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো— আত্মহত্যা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তায় সবাইকে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করা। প্রতি বছর এদিনে বিভিন্ন দেশে সেমিনার, কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো মানসিক রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আত্মহত্যায় তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছেন প্রায় ১৫ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের আত্মহত্যার হার প্রায় ৪০ শতাংশ। এছাড়াও পুরুষের চেয়ে নারীদের আত্মহত্যার হার বেশি— যা প্রায় ৬০ শতাংশেরও ওপরে।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, ২০২৪ সালে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক ঘটনাই গণমাধ্যমে আসেনি। বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আঁচলের তথ্যমতে, আত্মহননকারীদের মধ্যে ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী সবচেয়ে বেশি—যা ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর ২০-২৫ বছর বয়সী ২৪ শতাংশ। শিশুদের (১-১২ বছর) মধ্যেও এ প্রবণতা ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে নারীর সংখ্যা সর্বাধিক ৬১ শতাংশ, পুরুষ ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ০.৩ শতাংশ। শিক্ষা পর্যায়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা, যা ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ।

যেসব কারণে আত্মহত্যা

আঁচলের প্রতিবেদন বলছে— অভিমান ও পারিবারিক অবহেলা ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ, প্রেমঘটিত টানাপোড়েন ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অ্যাকাডেমিক চাপে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। ফাউন্ডেশন জানায়, এর আগে ২০২১ সালে ১০১ জন, ২০২২ সালে ৫৩২ জন এবং ২০২৩ সালে ৫১৩ জন এবং ২০২৪ সালে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন।

মানসিক সমস্যা থেকে যায় ‍মনোযোগের বাইরে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া (ছদ্মনাম) বলেন, “প্রতিদিন মনে হয়, আমি সবাইকে হতাশ করছি। পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের লক্ষ্য আর বাস্তবতার মধ্যে মিল পাই না। কাউকে বলতেও ভয় হয়, হয়তো সবাই আমাকে দুর্বল ভাববে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী রাহাত জানান, কীভাবে একজন সমস্যায় আছে, তা জানার পরও কথা বলা হয় না, তার মানসিক পরস্থিতি জানতে। তিনি বলেন, “আমাদের হলে গত বছর এক বন্ধু গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেলো। আমরা জানতাম সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, কিন্তু খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ ছিল না। এখন মনে হয়, আমরা যদি আগেই কিছু করতাম, হয়তো বাঁচানো যেতো।”

পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়— ২০২০ সালে আত্মহত্যার ঘটনা প্রায় ১০ হাজার ৮০০টি, ২০২১ সালে প্রায় ১২ হাজার, ২০২২ সালে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০, ২০২৩ সালে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ এবং ২০২৪ সালে প্রায় ১৫ হাজারেও বেশি। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যবিষয়ক হেল্পলাইন নম্বর ৩৩৩ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মানসিক স্বাস্থ্য হটলাইনে গত এক বছরে কল বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ১৮ হাজার কল রেকর্ড হয়েছিল, সেখানে ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ হাজারেও বেশি। ফলে দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মনোরোগ বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের আত্মহত্যা এখন একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকট। একদিকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা, অপরদিকে কার্যকর সাপোর্ট সিস্টেমের অভাব— সব মিলিয়ে এ সময়ের তরুণরা চরম বিপর্যস্ত। এখনই পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্র একসঙ্গে এগিয়ে না এলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাধ্যতামূলক কাউন্সেলিং সেন্টার চালু করা, হেল্পলাইন নম্বর ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা, উদ্ধারকারীদের সংবেদনশীলতার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে শেখানোর বিষয়ে সচেতন হতে হবে। পৃথিবীতে উন্নত বহু দেশে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকায় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কোর্স চালু করা হয়েছে। একইসঙ্গে পরিবারকে সচেতন করার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। আমাদেরও সেদিকে যেতে হবে।

কাউন্সেলিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং ডিপার্টমেন্ট অ্যান্টি সুইসাইডাল স্কোয়াডের প্রধান সৈয়দ তানভীর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “তরুণদের মানসিক সমস্যাগুলো আমরা এখনও গুরুত্ব দিয়ে দেখি না। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা স্ট্রেস, প্রেমঘটিত সমস্যা, কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশায় ডুবে থাকে। কিন্তু সাপোর্ট সিস্টেম দুর্বল হওয়ায় তারা একা হয়ে পড়ে।”

মনোবিজ্ঞানী ডা. ফারজানা ইসলাম বলেন, “যুব সমাজ আজকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। সোশ্যাল মিডিয়া তাদের জীবনের তুলনার চাপ বাড়াচ্ছে। আর পরিবারগুলোও সন্তানের আবেগিক দিক নিয়ে সচেতন নয়। ফলে ডিপ্রেশন ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।’’

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আত্মহত্যা একটি স্বাভাবিক মানসিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত। সাধারণত মানসিক রোগ, বিশেষ করে বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া বা মাদকাসক্তির মতো সমস্যায় আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তরুণদের ক্ষেত্রে আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বড় ভূমিকা রাখে। এজন্য পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব হলো— শিশুদের আত্মবিশ্বাসী, স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা এবং সামাজিক মেলামেশায় অভ্যস্ত করা।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুল-কলেজে প্যারেন্টস মিটিংয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের অন্তর্ভুক্তি এবং প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ জরুরি। এতে তরুণদের চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে এবং আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।’’