ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, বহু নির্যাতন সহ্য করেও বেগম খালেদা জিয়া কখনও অভিযোগ করেননি। সকালের নাশতা বা রমজানের ইফতার—সব অনুষ্ঠানে তার অতিথিপরায়ণতা ও আন্তরিকতা সবাইকে মুগ্ধ করতো।
যুক্তরাষ্ট্রের শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় ওয়াশিংটনের কূটনীতিক, সাংবাদিক ও নীতিনির্ধারকরা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার ঐতিহাসিক ভূমিকা তুলে ধরেন।
সোমবার সন্ধ্যায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের সদস্য ও মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন প্রেস ক্লাবের নবনির্বাচিত ১১৯তম প্রেসিডেন্ট মার্ক শেফ, এপি’র সাবেক সম্পাদক ম্যারন বিলকাইন্ড, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা ও মার্শা বার্নিকাট, স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো স্টিভ রোজ, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান ইকবাল বাহার চৌধুরী, বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মুর্তজা ও আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক এহতেশামুল হক।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, “খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে। বিপদ ও সংকটের মধ্যেও তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল এবং আন্তরিক। তিনি ছিলেন অমায়িক ও উদার হৃদয়ের মানুষ, যিনি বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন। একজন নারী হিসাবে তিনি বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা এশিয়ায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন তার লিগ্যাসি স্মরণে থাকবে।”
রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, “আমরা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করছি না, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রটেক্টর এবং অর্থনৈতিক প্রগতির নির্মাতা। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং বিরোধী মতের কণ্ঠ রুদ্ধ থাকলেও তিনি নির্ভীক চিত্তে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বে নজির সৃষ্টিকারী এক অনন্য নেতা।”
তিনি আরও বলেন, “খালেদা জিয়ার সাহসের উৎস ছিল ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের সময় তিনি অস্ত্র সরানোর উদ্যোগে বাধা দেন এবং স্বামী মেজর জিয়াউর রহমানের অনুমতি ছাড়া তা কার্যকর হয়নি। এই দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।”
তিনি বলেন, “খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অন্যায়ভাবে কারাগারে রাখা হয়েছে। এই হয়রানির বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে প্রতিবাদ হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্টে একে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।”
বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা বলেন, “খালেদা জিয়া অন্যকে সম্মান দিয়ে নিজেও সম্মানিত হতেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি অন্যদের খোঁজ-খবর নিতেন। গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আমার সঙ্গে সবসময় আন্তরিক ছিলেন এবং যখনই চেয়েছি তার সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। অসামান্য অবদান রেখেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে তিনি সংগ্রাম করেছেন। অন্যরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে, তিনি তা করেননি। কখনও প্রশ্ন করেননি কেন তাকে এই ধরনের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি ছিলেন উন্মুক্ত ও উদার হৃদয়ের মানুষ।”
ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি মার্ক শেফ বলেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চ্যাম্পিয়নের স্মরণসভা আয়োজন করতে পেরে আমরা গর্বিত। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।”
সাংবাদিক ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, “১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতির হাল ধরেন। সমর্থকদের চাপের মধ্যে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন এবং দীর্ঘ সময় রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন।”
এহতেশামুল হক বলেন, “১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আটক হওয়া, স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত, সন্তানদের নিয়ে সীমাহীন অনিশ্চয়তা—সব কিছুকে ছাপিয়ে তিনি গণতন্ত্রের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যেও তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি।”
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মুর্তজা বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়া পরিবার সর্বাধিক জনপ্রিয় অবস্থানে পৌঁছেছে। গণতন্ত্র ও জাতীয় রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবদান অনস্বীকার্য।”
ম্যারন বিলকাইন্ড বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—গণতন্ত্র কোনও উপহার নয়, এটি রক্ষার জন্য প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতে হয়। ক্ষমতায় থাকা মানুষই ইতিহাস গড়ে না, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধৈর্য ও সাহস দেখানো মানুষই ইতিহাসের নায়ক হয়ে থাকে।”
আলোচনা সভার শুরুতে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।