ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতায় বন্দর শ্রমিকদের ধর্মঘট, শাহবাগে সংহতি সমাবেশ

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতায় বন্দর শ্রমিকদের ধর্মঘটের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশ করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকালে আয়োজিত এই সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

সমাবেশে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাসের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক দীপা দত্ত, চিকিৎসক ডা. হারুন উর রশীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, গবেষক ও লেখক মাহতাব উদ্দীন আহমেদ, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর প্রেসিডেন্ট দিলীপ রায় এবং জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শামীম ইমাম।

এছাড়া কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শুভাশিষ চাকমা, বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলনের সদস্য বেলাল চৌধুরী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ছায়েদুল হক নিশান, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের কামাল হোসেন বাদল, এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য খান আসাদুজ্জামান মাসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের পক্ষ থেকে কাইয়ুম হোসেন, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সবুজ, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মানস নন্দী, গণতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলনের সদস্য সচিব সুশান্ত সিনহাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সভায় বক্তারা বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা। যে চুক্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ৩০, ৪০, ৫০ বা ৬০ বছরের জন্য বাঁধা পড়ে যাবে, সে ধরনের চুক্তি করার কোনো অধিকার বা এখতিয়ার একটি অন্তর্বর্তী সরকারের না থাকলেও বর্তমান সরকার জোরজবরদস্তি ও তড়িঘড়ি করে তা করতে যাচ্ছে।

বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান বন্দর এবং দেশের শতকরা ৯০ ভাগ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দর দিয়ে হয়। সেই বন্দর যখন একটি বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে যাবে, তখন পুরো বাংলাদেশই জিম্মি হয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পকেট রাষ্ট্রের কোম্পানির হাতে। এর অর্থ হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদী একটি বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়বে।

উপস্থিত বক্তারা আরও প্রশ্ন করেন, জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের রুটিন কাজ করার কথা, তখন তারা এনসিটি ইজারার চুক্তি স্বাক্ষর করছে। অথচ এই স্বাক্ষরের বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদ করছে, শ্রমিকেরা প্রতিবাদ করছে, বিশেষজ্ঞরা প্রতিবাদ করছেন। এমনকি বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদেরও বিরোধিতা আছে। তাহলে কার স্বার্থে এই চুক্তি হচ্ছে এবং এই চুক্তি না করলে সরকারের কী সমস্যা হবে?

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার পর নিউমুরিং টার্মিনাল থেকে আয় ও মাশুল কমবে। এই চুক্তি করার জন্য কিছুদিন আগে সব পণ্যের ওপর মাশুল বাড়ানো হয়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি খরচ বাড়বে এবং পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অস্বচ্ছতা, অযৌক্তিকতা ও নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হচ্ছে। উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর মুখোশ পরিয়ে এই সরকারে ইউনূস সাহেব (প্রধান উপদেষ্টা) প্রকৃতপক্ষে বিদেশি কোম্পানি ও বিদেশি রাষ্ট্রের লবিস্টদের নিয়োগ করেছেন।

এনসিটি ইজারার চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন) মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে—অন্তর্বর্তী সরকার কেন ও কিসের বিনিময়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো করছে, তার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যেন দেশ থেকে বের হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলো কেন সরকারের জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই চুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলছে না। এসব চুক্তির বিরোধিতা যারা করছে না, তারা কীভাবে ক্ষমতায় গিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম, ভারতের আধিপত্যবিরোধী কিংবা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে নিতে পারবে?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (গোপনীয়তার চুক্তি) প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, জনগণের মতামত মূল্যায়ন না করে বা কোনও পর্যালোচনা ছাড়াই সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে এনসিটি ইজারার চুক্তি করা হচ্ছে। আমরা এই চুক্তির নিন্দা জানাই এবং এর বিরুদ্ধে বন্দরে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি জানাচ্ছি।