সম্প্রতি নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধিত বেসরকারি সংস্থা পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্টের (পাশা) পর্যবেক্ষক কার্ড বিতরণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনে সংস্থাটির ১০ হাজার পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। তবে, অভিযোগ ওঠে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষক সরবরাহ করার সক্ষমতা নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সংস্থাটির পর্যবেক্ষক কার্ড বিতরণ স্থগিত করা হয়।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে শুধু ‘পাশা’ই নয়, আরও কয়েকটি সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। যদিও নির্বাচনি পর্যবেক্ষক সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার বিষয়টি নতুন নয়— বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভুয়া পর্যবেক্ষকের প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, বারবার কেন জাতীয় নির্বাচনে ভুয়া পর্যবেক্ষক সংস্থা দায়িত্ব পাচ্ছে? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের অযোগ্যতা, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া সংস্থা নির্বাচন করা এবং অভিযুক্তদের কখনও জবাবদিহিতার আওতায় না আনার কারণেই এসব ঘটনা বারবার ঘটছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে ব্যর্থতা বা ঘাটতি নির্বাচন কমিশনের। এ দায় তাদেরই নিতে হবে। যাচাই করা হয়নি। পাশা এত কার্ডের অনুমোদন পেয়ে গেলো, অনুমোদনের পর কার্ড স্থগিত করা হলো। কিন্তু উচিত ছিল এই সংস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কেন প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হলো? যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষক, বিষয়টিকে ব্যবসা বা বিনিয়োগ হিসেবে দেখে, কিংবা স্থানীয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের ক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রভাব তৈরির ঝুঁকি থাকে। নির্বাচন কমিশন যদি পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আগে যা ঘটেছে, সেখান থেকে যদি শিক্ষা না নেওয়া হয়, সেটি দুর্ভাগ্যজনক। শুধু পাশা নয়, যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতা ও দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও যারা পর্যবেক্ষক হিসেবে আবেদন করেছে, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।’
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা উচিত। কেন এমন হলো, তা নির্বাচন কমিশনের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর ইন্ধন ছিল কিনা, সেটিও যাচাই করে সংস্থাগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।’
কেন এবারও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা নিয়ে অভিযোগ উঠছে—এ প্রশ্নে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকেই প্রশ্ন করতে হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তো কিছু মানদণ্ড থাকার কথা। তারা যাচাই-বাছাই করেছে কিনা, যারা এসব করেছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে— এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, এগুলো নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার পরিচয় বহন করে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিটিক্স বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অযোগ্যতা রয়েছে। তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই করতে পারেনি। অনেক অভিজ্ঞ নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ছিল, যারা এবার পর্যবেক্ষণে নেই। এতে প্রশ্ন ওঠে— নির্বাচন কর্তৃপক্ষ কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কিনা। এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখনও দু-দিন সময় আছে। নির্বাচন কমিশন মাঠপর্যায়ে তদন্ত করলে অন্য সংস্থার ক্ষেত্রেও অভিযোগ প্রমাণিত হলে কার্ড স্থগিত করা সম্ভব।’
পাশার মতো সংস্থার নির্বাচন পর্যবেক্ষক হওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে সমালোচনা শুরু হয়। স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন তোলে রাজনৈতিক দলগুলো।
পাশার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে পর্যবেক্ষকের নামে কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। পর্যবেক্ষক নিয়োগে নানাবিধ অসংগতি আছে।’ একটি রাজনৈতিক দল পরিকল্পিতভাবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে পাশার বিষয়টি আলোচনায় এলেও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্বচ্ছ ও অবাধ করতে ৮১টি দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাকে ভোট পর্যবেক্ষণের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় ভোট পর্যবেক্ষক রয়েছেন ৭ হাজার ৯৯৭ জন এবং কেন্দ্রীয় ভোট পর্যবেক্ষক ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন।
তবে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলোর অনেকগুলোরই মাঠপর্যায়ে অস্তিত্ব নেই। কোনও কোনও সংস্থার অফিসের ঠিকানায় পাওয়া গেছে ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকান, কোথাও আবার আবাসিক ভবন। কিছু সংস্থার ঠিকানা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ‘প্রসোশনাল রিসার্স এডভোকেসি ট্রেনিং অ্যাকশন ইয়ার্ড (প্রত্যয়)’ নামের একটি সংস্থা ইসিতে নিবন্ধনের আবেদন করে। সংস্থার শীর্ষ কর্তা হিসেবে রোকেয়া জাহানের নাম দেওয়া হয়। অফিসের ঠিকানা হিসেবে আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির একটি ঠিকানা উল্লেখ করা হলেও সেখানে গিয়ে ‘প্রত্যয়’ নামের কোনও অফিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই ঠিকানায় একটি মুদি দোকান পাওয়া গেছে।
কমিউনিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর রুরাল ডেভেলাপমেন্ট (কার্ড) নামের সংস্থার দেওয়া ঠিকানাতেও অফিসের কোনও তথ্য মেলেনি। ভলান্টারি রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির ক্ষেত্রেও দেওয়া ঠিকানায় সংস্থার কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব ঠিকানা ভুয়া।
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ৮১টি নিবন্ধনযোগ্য সংস্থার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এর আগে ২৭ জুলাই এ বিষয়ে আবেদন আহ্বান করে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
ইসি সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের নীতিমালা বাতিল করে নতুন দেশীয় পর্যবেক্ষক নীতিমালা–২০২৫ জারি করা হয়েছে। ২০০৮ সালে প্রথমবার ১৩৮টি সংস্থা পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধন পায়। ২০১৮ সালে ছিল ১১৮টি এবং ২০২৩ সালে ৯৬টি সংস্থা।
২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে দেশীয় পর্যবেক্ষক ছিলেন মোট ২০ হাজার ৭৭৩ জন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদিত ৪০টি সংস্থার ৫১৭ জন এবং স্থানীয়ভাবে ৮৪টি সংস্থার ২০ হাজার ২৫৬ জন। ওই নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক ছিলেন ১৬৩ জন। এর মধ্যে ওআইসি ও কমনওয়েলথের ৩৮ জন, বিভিন্ন মিশনের ৬৪ জন এবং দূতাবাস ও হাইকমিশনে কর্মরত বাংলাদেশি ছিলেন ৬১ জন।